শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তোলা, পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানো এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ঢাকার ২১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ক্লিন স্কুল টিম’ নামে একটি পাইলট প্রকল্প চালু করেছে ঢাকা জেলা প্রশাসন।
বুধবার ঢাকা জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান মিঞা। ঢাকা মহানগরের পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ জেলার ১৬টি উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিয়ে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
জাপানের বিদ্যালয়গুলোতে প্রচলিত ‘ওসোজি’ পরিচ্ছন্নতা মডেলের আদলে তৈরি এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য শুধু বিদ্যালয় পরিষ্কার রাখা নয়; বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, শ্রমের মর্যাদা, শৃঙ্খলা ও পরিবেশের প্রতি যত্নশীল মনোভাব গড়ে তোলা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিভাগীয় কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান মিঞা বলেন, ‘ওসোজি মডেল শুধু পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম নয়, এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার একটি কার্যকর উদ্যোগ। শিক্ষার্থীরা নিজের বিদ্যালয় নিজে পরিচ্ছন্ন রাখার অভ্যাস গড়ে তুললে তা তাদের পরিবার ও সমাজেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’
তিনি বলেন, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ মডেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে চান তাঁরা। এ জন্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
একই সঙ্গে মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা প্রতিরোধে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান বিভাগীয় কমিশনার। তিনি বলেন, সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের খোঁজ রাখতে হবে। সামাজিক সচেতনতামূলক উদ্যোগগুলো বিদ্যালয় থেকে শুরু করে পরিবার পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে হবে।
ঢাকার জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, ‘পরিচ্ছন্নতা শুধু বিদ্যালয় পরিষ্কার রাখার বিষয় নয়, এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, শ্রমের মর্যাদা ও পরিবেশের প্রতি যত্নশীল মনোভাব গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আজকের পরিচ্ছন্ন বিদ্যালয়ই আগামী দিনের সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির ভিত্তি।’
তিনি আরও বলেন, পরিচ্ছন্নতার চর্চা শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। ছোট পরিসরে শুরু করে সবাই সম্মিলিতভাবে চেষ্টা চালালে এ উদ্যোগ সফল হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জেলা প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কর্মসূচির আওতায় বিদ্যালয়ের রুটিন অনুসারে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ মিনিট পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে শ্রেণিকক্ষ, করিডোর ও পাঠাগারের মতো নিরাপদ স্থান পরিষ্কারের দায়িত্ব দেওয়া হবে। শিক্ষকরা এ কার্যক্রম তদারকি করবেন। তবে টয়লেট, নোংরা ড্রেন ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থান পরিষ্কারের দায়িত্ব পালন করবেন সংশ্লিষ্ট কর্মীরা।
এ ছাড়া প্রতি সপ্তাহে অন্তত এক দিন বিদ্যালয়ে ডেঙ্গুর ঝুঁকি পরিদর্শন করা হবে। এ সময় কোথাও পানি জমে আছে কি না, পানির পাত্র যথাযথভাবে ঢেকে রাখা হচ্ছে কি না এবং এডিস মশার প্রজননস্থল রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে। চিহ্নিত ঝুঁকি দূর করার উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি অগ্রগতি চেকলিস্টে লিপিবদ্ধ করা হবে।
বিদ্যালয়ের বাইরেও পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস ছড়িয়ে দিতে ‘আমার বাসা, আমার দায়িত্ব’ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় শিক্ষার্থীদের সাপ্তাহিক পরিচ্ছন্নতা চেকলিস্ট দেওয়া হবে। ঘর গুছিয়ে রাখা, নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলা এবং বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়ার মতো বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। প্রতি রোববার শিক্ষকরা চেকলিস্ট মূল্যায়ন করবেন।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিদ্যালয়ে পচনশীল, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও অন্যান্য বর্জ্য আলাদাভাবে ফেলার ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি ডাস্টবিনের সঠিক ব্যবহার এবং পচনশীল বর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরির বিষয়েও শিক্ষার্থীদের ধারণা দেওয়া হবে।
পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যক্রম, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে বিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হবে। এ ক্ষেত্রে সেরা বিদ্যালয়, শ্রেণি ও শিক্ষার্থীদের সনদ, বই, শিক্ষা উপকরণ অথবা গাছের চারা দিয়ে পুরস্কৃত করার প্রস্তাব রয়েছে।
জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের উদ্যোগে নেওয়া এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতার চর্চা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পরিবার ও সমাজেও সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া।
জেলা প্রশাসন জানায়, গত ৮ জুলাই শিক্ষার্থীদের পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে রাজধানীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘ক্লিন স্কুল টিম’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে প্রায় তিন মাস ধরে গবেষণা, বিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন দেশের পরিচ্ছন্নতা পদ্ধতি বিবেচনা করে বাংলাদেশের উপযোগী করে জাপানি বিদ্যালয়ের ‘ওসোজি’ মডেলের আদলে এ কর্মসূচির বাস্তবায়ন পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়।