মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, এআইয়ের প্রভাব বিশেষজ্ঞদের নিজস্ব বিচার-বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
গবেষণায় ৫০ জন পেশাদার বিশ্লেষককে একটি কাল্পনিক কৃষি সমবায়ের পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁদের কাজ ছিল সমবায়ের সদস্যদের জন্য পরিচালিত একটি পরামর্শ কর্মসূচি কার্যকর কি না এবং সেটির পরিধি বাড়ানো উচিত কি না, তা মূল্যায়ন করা। বিশ্লেষকেরা কারণ ও ফলাফলের সম্পর্ক নির্ণয়ে অভিজ্ঞ ছিলেন।
চূড়ান্ত সুপারিশ দেওয়ার আগে তাঁদের দুটি গ্রহণযোগ্য বিকল্পের মধ্যে চারটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এর মধ্যে ছিল উৎপাদনশীলতা পরিমাপের পদ্ধতি, তুলনা করার কৌশল, কোন খামারগুলো মূল্যায়নের আওতায় থাকবে এবং ফলাফল নির্ধারণে কীভাবে ওজন প্রয়োগ করা হবে।
গবেষকদের মূল উদ্দেশ্য ছিল, এআই সহকারীর পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে কি না, তা পরীক্ষা করা। এ জন্য বিশ্লেষকদের অজান্তেই প্রতিটি এআই সহকারীকে নির্দিষ্ট কিছু সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কোন বিকল্পের পক্ষে এআই অবস্থান নেবে, তা দৈবচয়নের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়।
অ্যানথ্রপিকের গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্লেষকেরা চারটি বিশ্লেষণধর্মী সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ৮৬ শতাংশ সময় এআই সহকারীর পছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেছেন। এআইয়ের কোনো প্রভাব না থাকলে গবেষকদের প্রত্যাশিত ফল ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, এআইয়ের পরামর্শ নেওয়ার আগেই যেসব বিশ্লেষক নিজেদের পছন্দের কথা জানিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে এআই ভিন্নমত দিলে ৬০ শতাংশ নিজেদের আগের অবস্থান পরিবর্তন করেন। বিপরীতে, এআইয়ের মতের সঙ্গে তাঁদের আগের পছন্দ মিলে গেলে অবস্থান পরিবর্তনের হার ছিল ৬ শতাংশ।
এআইয়ের যুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য প্রবণতা দেখা গেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৭৭ শতাংশ বিশ্লেষক নিজেদের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এআই সহকারীর যুক্তি ব্যবহার করেছেন। তবে মাত্র ১৫ শতাংশ তাঁদের যুক্তির উৎস হিসেবে এআইয়ের কথা উল্লেখ করেছেন।
গবেষকদের মতে, এআইয়ের প্রভাব বিশেষজ্ঞদের নিজেদের কাছেও সব সময় স্পষ্ট নাও হতে পারে। ফলে কোনো সিদ্ধান্তে মানুষের নিজস্ব বিচার-বিশ্লেষণ কতটা কাজ করেছে এবং এআইয়ের পরামর্শ কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, এ ফলাফল ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে কয়েকটি সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। গবেষণাটি একটি নির্দিষ্ট ধরনের কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। পাশাপাশি এআই সহকারীগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে নির্দিষ্ট বিকল্পের পক্ষে অবস্থান নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। বাস্তব পরিস্থিতিতে এআইয়ের প্রভাব একই মাত্রায় থাকবে কি না, তা এ গবেষণা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
গবেষক আমাচ হেরদাগদেলেন, হেইলি জোরেন ও অ্যালেক্স ট্যামকিনের মতে, এআইয়ের ওপর নির্ভর করার প্রবণতা বিশেষজ্ঞদের জন্যও শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। তাঁদের আশঙ্কা, এআইয়ের নিজস্ব প্রবণতা বা পক্ষপাত গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। এআই নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গবেষণাপত্রে তাঁরা উল্লেখ করেন, এআইয়ের মাধ্যমে কাজের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বিচার-বিশ্লেষণকে কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা হিসেবে ধরে রাখতে হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কাজের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের নিজস্ব অনুমান, মূল্যবোধ ও অগ্রাধিকার স্পষ্টভাবে প্রকাশে সহায়তা করাও জরুরি।
গবেষকদের মতে, শুধু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হলো, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায় বিশেষজ্ঞরা নিজেদের অবস্থান ও অগ্রাধিকার কতটা বুঝতে পারছেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যানথ্রপিক ও অন্যান্য এআই প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি নিয়ে বর্তমানে উৎপাদনশীলতা, নিরাপত্তা এবং সামাজিক প্রভাব বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এআইয়ের সমর্থকদের মতে, এ প্রযুক্তি কাজের গতি ও দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, দ্রুত প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে কর্মসংস্থানে পরিবর্তন, সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে মানুষের স্বাধীন বিচার-বিশ্লেষণ দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
অ্যানথ্রপিকের গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, এআইকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি এর পরামর্শ যাচাই করা এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে মানুষের স্বাধীন বিচার-বিশ্লেষণ নিশ্চিত করাও জরুরি। তবে একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে এআই ব্যবহারের সব ক্ষেত্র সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।