সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মূল প্রতিষ্ঠান। তাদের বাণিজ্যিক ব্যবহারের শর্তাবলি থেকে বিতর্কিত একটি বিধান বাদ দিয়েছে। ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটের তথ্য সংগ্রহ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এমন উদ্বেগের পর গত ১৭ অক্টোবর শর্তাবলিতে এই পরিবর্তন আনে প্রতিষ্ঠানটি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিম্যান জার্নালিজম ল্যাবের ১৫ ও ১৭ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়, মেটার প্রস্তাবিত নতুন শর্তের ভাষা নিয়ে আইন ও মেধাস্বত্ব বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, এর ফলে মেটার ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট ব্যবহারকারী সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের কনটেন্ট সংগ্রহ করে এআই-সংশ্লিষ্ট পণ্য উন্নয়নে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মেটার প্রস্তাবিত শর্তে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বা ওয়েব ক্রলারের মাধ্যমে ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডোমেইন, ওয়েবপেজ ও ইউআরএলে প্রবেশ, তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং হালনাগাদ তথ্য নেওয়ার অনুমতির কথা বলা হয়েছিল। সংগৃহীত তথ্য মেটার পণ্য ও সেবার উন্নয়ন, গবেষণা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং এআই মডেল প্রশিক্ষণেও ব্যবহৃত হতে পারে; এমন ভাষা রাখা হয়েছিল।
এই বিধান নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কারণ ছিল এর ব্যাপক পরিধি। তাঁদের মতে, শর্তটির ভাষা এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে, যাতে ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত ওয়েবসাইটের কনটেন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধিনিষেধ ও ওয়েবসাইট মালিকদের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন সামনে আসে।
বিশেষ করে সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ ও অন্যান্য কনটেন্ট এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এ ধরনের কনটেন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে কপিরাইট, অনুমতি এবং ন্যায্য ব্যবহারের আইনি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
বিতর্কের অন্যতম বিষয় ছিল ‘রোবটস ডট টিএক্সটি’ ফাইল। ওয়েবসাইটের মালিকেরা এই ফাইলের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় ক্রলারকে তাঁদের ওয়েবসাইটের কোন অংশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দিতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ছিল, মেটার বাণিজ্যিক শর্তের বিস্তৃত ভাষা ভবিষ্যতে ওয়েবসাইটের মালিকদের দেওয়া এসব নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরির যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। তবে এটি যে নিশ্চিতভাবেই ঘটবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি তাঁরা; বরং শর্তের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা ও আইনি কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
মেটার পক্ষ থেকে বলা হয়, শর্তাবলির পরিবর্তন ওয়েব ক্রলিংয়ের পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন আনছে না। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ওয়েবসাইটের মালিকেরা আগের মতোই রোবটস ডট টিএক্সটি ফাইলের মাধ্যমে তাঁদের ওয়েবসাইটে তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে পছন্দ ও নির্দেশনা জানাতে পারবেন।
গত ১৭ অক্টোবর সংশোধিত শর্তে মেটা ‘প্রশিক্ষণ’ বা ‘ট্রেন’ শব্দটি বাদ দেয় এবং তথ্য ব্যবহারের উদ্দেশ্যকে বিজ্ঞাপন ও ব্যবসায়িক পণ্যের উন্নয়ন, গবেষণা ও রক্ষণাবেক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, ক্রলিং-সংক্রান্ত শর্তগুলো মূলত বিজ্ঞাপন ও ব্যবসায়িক পণ্যের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য; সংশোধনের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।
তবে নিম্যান জার্নালিজম ল্যাবের পরবর্তী প্রতিবেদনে আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, সংশোধিত শর্তেও ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত তথ্য বিজ্ঞাপন ও ব্যবসায়িক পণ্য উন্নয়নে ব্যবহারের বিস্তৃত সুযোগ রয়েছে। ‘ব্যবসায়িক পণ্য’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট না হওয়ায় উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যবসায়িক পণ্যের উন্নয়নে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে তথ্য ব্যবহারের পরিধি নিয়ে নতুন প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। তবে সংশোধিত শর্তের ভিত্তিতে মেটা নিশ্চিতভাবেই সংবাদমাধ্যমের কনটেন্ট এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহার করবে; এমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
মেটার এই নীতিমালা বিতর্ক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর এআই উন্নয়নে অনলাইন কনটেন্ট ব্যবহারের অধিকার নিয়ে চলমান আলোচনাকে আরও সামনে এনেছে। একদিকে এআই মডেল উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ তথ্যের প্রয়োজন, অন্যদিকে সংবাদমাধ্যম ও ওয়েবসাইটের মালিকদের কনটেন্টের ওপর অধিকার এবং ব্যবহারের শর্ত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ক্ষেত্রে নীতিমালার ভাষা স্পষ্ট করা, তথ্য সংগ্রহের পরিধি নির্ধারণ এবং ওয়েবসাইট মালিকদের সিদ্ধান্তকে সম্মান করার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।
মেটা বিতর্কিত শর্ত সংশোধন করলেও তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের সীমা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির চূড়ান্ত নীতিমালা কীভাবে কার্যকর হয় এবং ওয়েবসাইট মালিকদের নিয়ন্ত্রণ কতটা সুরক্ষিত থাকে, তা ভবিষ্যতে এআই ও ডিজিটাল কনটেন্টের অধিকারসংক্রান্ত আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।