ইংল্যান্ড সফরের দুঃসহ স্মৃতি পেছনে ফেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করলেন সালমান আলি আগা। দীর্ঘ বিরতির পর পাকিস্তানের জার্সিতে ফিরেই ব্যাট হাতে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিলেন এই অভিজ্ঞ ক্রিকেটার। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে তাঁর দুর্দান্ত শতকে ৩৭ রানের জয় পেয়েছে পাকিস্তান। ম্যাচসেরা হয়ে সালমান জানালেন, দুঃসময় কাটিয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে ঘরোয়া ক্রিকেটই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় অবলম্বন।
রোববার (১৮ অক্টোবর) রাওয়ালপিন্ডি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ৯০ বলে ১০৭ রানের ইনিংস খেলেন সালমান। তাঁর ইনিংসে ছিল ১০টি চার ও একটি ছক্কা। এই শতকের ওপর ভর করে ৪৯.৫ ওভারে ৩০৫ রানে অলআউট হয় পাকিস্তান। জবাবে ৪৮.১ ওভারে ২৬৮ রানে গুটিয়ে যায় শ্রীলঙ্কা। ফলে জয় দিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজের অভিযান শুরু করে স্বাগতিকরা।
গত আগস্টে ইংল্যান্ড সফরে লিডসে প্রথম টেস্টে পাকিস্তানকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সালমান। নিয়মিত অধিনায়ক বাবর আজমের চোটের কারণে দায়িত্ব পেয়েছিলেন তিনি। তবে সেই ম্যাচে পাকিস্তানের পারফরম্যান্স হতাশাজনক হওয়ায় পরের টেস্টে একাদশে জায়গা হারান এই অলরাউন্ডার। পরে সিরিজের মাঝপথে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের একাধিক সিদ্ধান্তের মধ্যে তাঁকেও দেশে ফিরতে হয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয় অনিশ্চয়তা।
তবে জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার হতাশায় থেমে থাকেননি সালমান। দেশে ফিরে মনোযোগ দেন ঘরোয়া ক্রিকেটে। প্রেসিডেন্টস ট্রফি গ্রেড-১-এ খেলতে নেমেই অপরাজিত ট্রিপল সেঞ্চুরি করেন তিনি। পরের ম্যাচে ৭২ রান করার পর আরেক ম্যাচে খেলেন ১৪৫ রানের ইনিংস। ধারাবাহিক এই পারফরম্যান্সে নিজের ব্যাটিংয়ের ছন্দ ফিরে পান তিনি।
এর মধ্যেই টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়কত্ব হারানোর পাশাপাশি ওই সংস্করণের দল থেকেও বাদ পড়েন সালমান। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের অবস্থান শক্ত করার জন্য ওয়ানডে সংস্করণই হয়ে ওঠে তাঁর সামনে বড় সুযোগ। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শতক হাঁকিয়ে সেই সুযোগ কাজে লাগানোর ইঙ্গিত দিলেন ৩২ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার।
ম্যাচ শেষে ঘরোয়া ক্রিকেটে ফেরার অভিজ্ঞতা নিয়ে সালমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে তাঁকে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তবে আগের চার বছরে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি। তাঁর মতে, একজন ক্রিকেটারের ক্যারিয়ারে খারাপ সময় আসতেই পারে। তাই ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিরে নিজের ভুল শুধরে নেওয়া এবং ছন্দ ফিরে পাওয়ার দিকেই মনোযোগ দিয়েছিলেন তিনি। এবারের পারফরম্যান্সকে সেই প্রচেষ্টারই ফল বলে মনে করেন সালমান।
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পাকিস্তানের ইনিংসও একপর্যায়ে চাপে পড়ে যায়। ১১৮ রানে চতুর্থ উইকেট হারানোর পর বড় সংগ্রহ গড়ার পথ কঠিন হয়ে ওঠে স্বাগতিকদের। এমন পরিস্থিতিতে হাসান নাওয়াজকে সঙ্গে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন সালমান। পঞ্চম উইকেটে দুজনের ৯৭ রানের জুটি পাকিস্তানকে ম্যাচে শক্ত অবস্থানে ফিরিয়ে আনে।
সালমানের ভাষ্য, ওই সময় উইকেটে ব্যাটিং করা তুলনামূলক সহজ মনে হচ্ছিল। তাই হাসান নাওয়াজের সঙ্গে আলোচনা করে নিজেদের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক ব্যাটিং চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তাঁদের লক্ষ্য ছিল একটি কার্যকর জুটি গড়ে শ্রীলঙ্কার বোলারদের ওপর চাপ তৈরি করা এবং দলকে ৩০০ রানের গণ্ডি পার করানো। শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনাই কাজে দেয়।
সালমানের ইনিংসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল পরিস্থিতি বুঝে ব্যাটিং করা। প্রায় ১১৯ স্ট্রাইক রেটে রান করলেও ইনিংসের শুরুতে বড় শট খেলার দিকে খুব বেশি ঝোঁকেননি তিনি। ৪৮ বলে অর্ধশতক পূর্ণ করার সময় তাঁর বাউন্ডারি ছিল মাত্র তিনটি।
ঝুঁকি কমিয়ে সিঙ্গেলস নেওয়া, ফাঁকা জায়গায় বল পাঠানো এবং দ্রুত দৌড়ে রান সংগ্রহ করাই ছিল তাঁর কৌশল। রাওয়ালপিন্ডির আউটফিল্ড প্রত্যাশার তুলনায় ধীরগতির থাকায় রান নেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি পরিশ্রম করতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ইংল্যান্ড সফরের হতাশা, দল থেকে বাদ পড়া এবং অধিনায়কত্ব হারানোর মতো কঠিন অভিজ্ঞতার পর সালমানের এই শতক তাঁর আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক রান করে পাওয়া ছন্দ এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চেও কাজে লাগালেন তিনি। সামনে ত্রিদেশীয় সিরিজের আরও ম্যাচ থাকায় এই ফর্ম ধরে রাখাই হবে তাঁর পরবর্তী চ্যালেঞ্জ।