ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বহু মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভে অংশ নিলেও কিছু বিক্ষোভকারীর সহিংস কর্মকাণ্ডে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ফ্রান্সের সরকার ঘটনাটিকে সহিংসতার গুরুতর বিস্তার হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বিক্ষোভে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। তবে দেশটির শ্রমিক সংগঠন সিজিটি (CGT) দাবি করেছে, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ। অর্থাৎ, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে সরকারি হিসাব ও আয়োজকদের হিসাবে পার্থক্য রয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভের একপর্যায়ে বিভিন্ন শহরে একদল সহিংস ব্যক্তি সরকারি ভবন, দোকানপাট ও পুলিশের ওপর হামলা চালায়। বিলাসপণ্যের দোকান ও সুপারমার্কেটে লুটপাটের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর লিমোজে সিটি হলে আগুন দেওয়া হয়। আগুনের তীব্রতায় ভবনটির ছাদের একটি অংশ ধসে পড়ে। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় মার্সেই শহরে বিক্ষোভকারীরা সিটি হলে প্রবেশ করে ভবনের বিভিন্ন স্থানে গ্রাফিতি আঁকে। লিওঁ শহরে পর্যটন দপ্তরেও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
রাজধানী প্যারিসেও সন্ধ্যার পর বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। এ সময় বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ, দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
সহিংসতার ঘটনায় ফরাসি কর্তৃপক্ষের দেওয়া প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, অন্তত ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং প্রায় ১৫০ জন পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য আহত হন। তবে ১৮ অক্টোবর রয়টার্সের পরবর্তী প্রতিবেদনে গ্রেপ্তারের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৮০০ এবং আহত পুলিশ সদস্যের সংখ্যা ৫০০-এর বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে পরিস্থিতির পরবর্তী হিসাব আগের তুলনায় আরও গুরুতর চিত্র তুলে ধরেছে।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ঁ ল্যকরনু সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার রয়েছে, কিন্তু অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও পুলিশের ওপর হামলার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি সহিংসতার জন্য উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠী ও অপরাধীদের দায়ী করেন। তাঁর বক্তব্য, সহিংসতার মাধ্যমে সরকারকে ভয় দেখিয়ে রাজনৈতিক দাবি আদায় করা যাবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টেও তিনি হুমকি ও ভীতির কাছে নতি স্বীকার না করার কথা জানান।
আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে এই বিক্ষোভ ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও চাপে ফেলেছে। তবে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সবাই সহিংসতায় জড়িত ছিলেন না; অধিকাংশ মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি তুলে ধরেছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ বিক্ষোভের নামে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করার অঙ্গীকার করেছেন।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার চেষ্টা এবং শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানানো মানুষের অধিকার বাধাগ্রস্ত করার বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিও সমর্থন জানান তিনি।
ফ্রান্সের পাশাপাশি শনিবার বেলজিয়াম, পর্তুগাল ও ইতালিতেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে অসন্তোষ থেকে বিক্ষোভ হয়েছে। তবে এসব দেশে বিক্ষোভের ব্যাপ্তি ফ্রান্সের তুলনায় কম ছিল।
অন্যদিকে, আলবেনিয়ায় দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের সংকট ও শিক্ষার মান নিয়ে অসন্তোষ থেকে বিক্ষোভকারীরা সমাবেশ করেন।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ ফ্রান্সের বিক্ষোভকে আরও বিস্তৃত করেছে। তবে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পাশাপাশি সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় দেশটির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।