রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকার নিউগিনি প্রপার্টিজ আবাসন প্রকল্পে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জমি দখল ও রাস্তা নিয়ে বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ৩৫ কাঠা জমি উদ্ধার করে দিতে পারলে এর একটি অংশের মালিকানা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলেন মামলার প্রধান আসামি শাহরিয়া মাহমুদ। ওই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই তিনি হামলার দায়িত্ব নেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, হামলা বাস্তবায়নে মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের স্থানীয় নেতা শাহ আলম অনিকসহ কয়েকজনের মাধ্যমে ভাসানটেক ও পল্লবী এলাকার বস্তি থেকে নিম্নআয়ের মানুষকে ভাড়া করা হয়। গত শনিবার রাতে তারা নিউগিনি প্রপার্টিজ আবাসন প্রকল্প এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
হামলার সময় দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আরও একজন গ্রেপ্তার
হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় সোমবার আরও একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার মিজানুর রহমান মামলার এজাহারভুক্ত ৯ নম্বর আসামি। তাকে নিয়ে এ ঘটনায় মোট ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এর আগে রোববার মুন্না, মামুন ও আসলামকে এবং সোমবার শাহরিয়া মাহমুদ ও শাহ আলম অনিককে আদালতে পাঠানো হয়। তাদের পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ক্যান্টনমেন্ট থানার পরিদর্শক (অপারেশন) সুব্রত দেবনাথ।
আদালত আগামী বুধবার রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য করে আসামিদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। অন্য তিন আসামির ক্ষেত্রেও বুধবার রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য রয়েছে। বর্তমানে পাঁচ আসামি কারাগারে রয়েছেন।
যে জমি নিয়ে বিরোধ
নিউগিনি প্রপার্টিজের ভেতরে থাকা ৩৫ কাঠা জমি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ কয়েকজনের নামে নিউগিনি প্রকল্পের ভেতরে ৩৫ কাঠা জমি রয়েছে। জমিটি প্রকল্পের শেষ প্রান্তে এবং বর্তমানে খালি পড়ে আছে। সেখানে যাওয়ার জন্য সরাসরি রাস্তা না থাকায় জমির মালিকরা সহজে সেখানে যেতে পারেন না। নিউগিনি প্রপার্টিজের পক্ষ থেকে সেখানে প্রবেশের পথ বন্ধ করে গেট দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জমির মালিকদের সঙ্গে নিউগিনি প্রপার্টিজ কর্তৃপক্ষের বিরোধ চলে আসছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে নিউগিনি প্রপার্টিজ কর্তৃপক্ষের দাবি, গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মোট ২৩ কাঠা জমি ছিল। এর মধ্যে ১৫ কাঠা কয়েক বছর আগে তিনি নিউগিনির কাছে বিক্রি করেন। বর্তমানে তাঁর আট কাঠা জমি রয়েছে। এর পাশেই অন্য কয়েকজনের আরও ১২ কাঠা জমি রয়েছে।
নিউগিনি কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই জমির মালিকদেরও জমিতে প্রবেশের রাস্তা না থাকায় তারা মহিউদ্দিনের সঙ্গে বিরোধে যুক্ত হয়েছেন। অন্যদিকে, বিক্রি করা ১৫ কাঠা জমির দখল নিয়েও বিরোধ তৈরি হয়েছে বলে তাদের বক্তব্য।
শাহরিয়ার সঙ্গে গোলাম মহিউদ্দিনের পূর্বপরিচয়
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে মামলার এক নম্বর আসামি শাহরিয়া মাহমুদের আগে থেকেই পরিচয় ছিল। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে জমি ‘উদ্ধার’ এবং জমিতে প্রবেশের ফটক ভেঙে দেওয়ার দায়িত্ব শাহরিয়া নেন বলে তদন্তে পাওয়া গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, জমি উদ্ধার করে দিতে পারলে শাহরিয়াকে এর একটি অংশের মালিকানা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তবে এই দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য এবং নথিপত্র যাচাই করে আরও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
যেভাবে হামলা চালানো হয়
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী শনিবার রাত সোয়া ১১টার দিকে দুই শতাধিক ব্যক্তি নিউগিনি প্রপার্টিজের দুই পাশের দুটি ফটক দিয়ে প্রকল্পের ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় গুলির শব্দ শোনা যায় বলেও সূত্রটি জানিয়েছে।
এর আগে ফটকসংলগ্ন বাইরের অংশে থাকা দুটি টিনের স্থাপনায় হামলা ও লুটপাট চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
চার নম্বর ফটক দিয়ে প্রবেশের পর কিছুটা সামনে এগোলেই বাম পাশে ছিল কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ও নিউগিনি প্রপার্টিজের অফিস। সেখানে ঢুকে হামলাকারীরা ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রকল্পের আরও কয়েকটি নির্মাণাধীন ভবনেও হামলা চালানো হয়। সেখানে কর্মরত নির্মাণশ্রমিকদের মারধর করে মোবাইল ফোন ও টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
হামলায় সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা
ঘটনার পর রোববার নিউগিনি প্রপার্টিজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া বাদী হয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন। মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ ১৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও প্রায় ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলায় শাহরিয়া মাহমুদকে এক নম্বর আসামি করা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র তাকে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করেছে।
মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে আবুল কাশেম ক্যান্টনমেন্ট থানা জামায়াতে ইসলামীর রোকন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া বাবুল হোসেন ও মোহাম্মদ শাহিনুজ্জামান স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া মামুন ও মুন্না ভাসানটেক বস্তির বাসিন্দা। আর আসলাম পেশায় অটোরিকশাচালক।
পুলিশের বক্তব্য
ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গিয়াস উদ্দিন বলেন, আসামি শাহরিয়া মাহমুদ ও শাহ আলম অনিককে সোমবার আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে। আদালত আগামী বুধবার রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য করেছেন।
এ ঘটনায় জমির মালিকানা, দখল, প্রবেশপথ এবং হামলার পেছনের পরিকল্পনা; সবকিছু তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। হামলায় কারা সরাসরি অংশ নিয়েছে, অস্ত্রের ব্যবহার কীভাবে হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে আরও কারা জড়িত, সেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।