এই বিপুল অর্থের লেনদেনের কারণে একদিকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নগরবাসীর স্বাভাবিক চলাচল, অন্যদিকে বাড়ছে যানজট, জনদুর্ভোগ ও সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজির সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, বারবার উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পরও কারা আবার ফুটপাত দখলের সুযোগ তৈরি করছে এবং এর পেছনে কারা লাভবান হচ্ছে?
বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় নিয়মিত হকারের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবের সময় এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছায়।
ফেডারেশনের হিসাবে, একজন হকারের কাছ থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ টাকা করে আদায় করা হলে দৈনিক আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ কোটি টাকার বেশি। সে হিসাবে বছরে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। তবে এটি কোনো সরকারি নিরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া রাজস্ব বা চাঁদার হিসাব নয়; ফেডারেশনের দেওয়া তথ্য ও অনুমানভিত্তিক হিসাব।
এর আগে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইজিডি) ‘দ্য স্টেট অব সিটিজ ২০১৬: ট্রাফিক কনজেশন ইন ঢাকা সিটি- গভর্ন্যান্স পারসপেক্টিভ’ শীর্ষক গবেষণায় ঢাকার ফুটপাত কেন্দ্রিক ব্যবসা থেকে বছরে প্রায় ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের হিসাব উঠে আসে।
পরবর্তী সময়ে গবেষণাটির প্রধান গবেষক অধ্যাপক মোহাম্মদ শানাওয়েজ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে জানান, হকারের সংখ্যা ও আদায়ের পরিমাণ বেড়েছে। তাঁর ধারণা, বর্তমানে এই অঙ্ক প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। তবে এ পরিমাণের হালনাগাদ স্বাধীন নিরীক্ষা প্রয়োজন।
রাজধানীর গুলিস্তান, নিউমার্কেট, বায়তুল মোকাররম, পল্টন, মতিঝিল, দৈনিক বাংলা মোড়, গোলাপশাহ মাজার, জিরো পয়েন্ট, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ ও ফুলবাড়িয়া এলাকায় ফুটপাতকেন্দ্রিক হকারদের উপস্থিতি বেশি। এসব এলাকায় ফুটপাতের বড় অংশজুড়ে দোকান, ভ্যান ও অস্থায়ী পসরা বসানো হয়।
তবে এ সমস্যা শুধু বাণিজ্যিক এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি ও আবাসিক এলাকার সামনের ফুটপাতেও অস্থায়ী দোকান ও স্থাপনা দেখা যায়।
হকারদের অভিযোগ, দোকানের আকার, অবস্থান ও ব্যবসার ধরন অনুযায়ী তাঁদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নেওয়া হয়। কোথাও ছোট দোকান বা ভ্যানের জন্য দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০ টাকা, আবার বড় দোকান বা টেবিলের ক্ষেত্রে আরও বেশি অর্থ দাবি করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহার ও নিরাপত্তার নামেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
এসব অর্থের বিনিময়ে ফুটপাতের নির্দিষ্ট জায়গায় ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন হকার। অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে দোকান সরিয়ে দেওয়া, পণ্য নিয়ে যাওয়ার হুমকি কিংবা ব্যবসা করতে বাধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ফুটপাতকেন্দ্রিক অবৈধ অর্থনীতির পেছনে একাধিক স্তরের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। হকারদের অভিযোগ এবং বিভিন্ন গবেষণায় উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে অর্থ সংগ্রহের জন্য লাইনম্যান বা মধ্যস্বত্বভোগীরা কাজ করেন। পরে সংগৃহীত অর্থ বিভিন্ন পর্যায়ে বণ্টন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইজিডির গবেষণায় চাঁদার অর্থ বণ্টন সম্পর্কে যে চিত্র উঠে এসেছিল, তাতে তিনটি পক্ষের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হয়। গবেষণায় সংগৃহীত অর্থের ৩০ শতাংশ পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে, ৪০ শতাংশ মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণকারী ও লাইনম্যানদের এবং বাকি ৩০ শতাংশ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কাছে যাওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে এই বণ্টনের হিসাব গবেষণার সময়কার তথ্য ও অভিযোগের ভিত্তিতে উঠে এসেছে। একে বর্তমান সময়ের সব এলাকা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও অনেক এলাকায় ফুটপাত নিয়ন্ত্রণের অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা টিকে থাকে। কখনো পুরোনো চক্রের সদস্যরা, কখনো নতুন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এই ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে উচ্ছেদ অভিযান হলেও কিছুদিন পর একই জায়গায় আবার দোকানপাট বসতে দেখা যায়।
অন্যদিকে, পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তাই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের চিহ্নিত করা জরুরি।
ঢাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করতে বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু এসব অভিযানের পরও একই জায়গায় আবার দোকান বসার ঘটনা প্রমাণ করে, সমস্যার গভীরে রয়েছে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার অভাব, অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ এবং হকারদের জীবিকার বাস্তবতা।
শুধু হকার উচ্ছেদ করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কারণ, হকারদের বড় একটি অংশের জীবিকা এই ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। তাঁদের বিকল্প কর্মসংস্থান বা ব্যবসার সুযোগ তৈরি না করে অভিযান চালালে একদিকে যেমন মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে কিছুদিন পর ফুটপাত পুনরায় দখল হওয়ার আশঙ্কাও থেকে যায়।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কয়েকটি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
ঢাকার সব হকারকে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজের আওতায় আনতে হবে। নিবন্ধিত হকারদের পরিচয়পত্র ও নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক অনুমতিপত্র দেওয়া যেতে পারে। এতে প্রকৃত হকারের সংখ্যা, ব্যবসার ধরন ও অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে নতুন করে অবৈধ দোকান বসানো এবং জায়গা দখল করে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা কমানো সম্ভব হবে।
নিবন্ধিত হকারদের কাছ থেকে নির্ধারিত হারে সরকারি ফি বা টোল আদায়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এই অর্থ সরাসরি সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত ব্যাংক হিসাব বা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। ডিজিটাল পেমেন্ট ও রসিদ ব্যবস্থা চালু করা হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের সুযোগ কমবে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয়ও বাড়বে।
ফুটপাতের জায়গা নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ অর্থ আদায় এবং হকারদের জিম্মি করে রাখার অভিযোগে যাঁদের নাম আসবে, তাঁদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়, প্রশাসনিক প্রভাব কিংবা পেশাগত অবস্থান বিবেচনা না করে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষ করে কোনো পুলিশ সদস্য, সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
ফুটপাতের মূল উদ্দেশ্য পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা। তাই ফুটপাতের নির্দিষ্ট অংশ সম্পূর্ণভাবে পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। কোথাও হকারদের ব্যবসার অনুমতি দেওয়া হলেও তা যেন পথচারীদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি না করে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
জনসমাগম, যানবাহনের চাপ ও সড়কের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে অপেক্ষাকৃত কম ব্যস্ত সড়ক বা নির্দিষ্ট স্থানে হকারদের ব্যবসার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। প্রয়োজনে সন্ধ্যার পর, সাপ্তাহিক ছুটির দিন কিংবা নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক ব্যবসার ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। তবে এসব ব্যবস্থার ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের চলাচল ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে হকারদের জন্য আধুনিক ও পরিকল্পিত হকার্স মার্কেট, নির্ধারিত বাজার কিংবা বিশেষ হকার্স কর্নার নির্মাণ করা প্রয়োজন। এসব স্থানে স্বল্প আয়ের ব্যবসায়ীদের জন্য সাশ্রয়ী ভাড়ায় দোকান বা ব্যবসার জায়গা বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। এতে ফুটপাতের ওপর চাপ কমবে এবং হকারদের জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থাও তৈরি হবে।
ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজি প্রতিরোধে সিটি করপোরেশন, পুলিশ, স্থানীয় সরকার, নাগরিক প্রতিনিধি এবং হকার সংগঠনের সমন্বয়ে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। উচ্ছেদ অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট স্থানগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে, যাতে আবার অবৈধ দখল তৈরি না হয়।
একই সঙ্গে কোথায়, কখন এবং কী কারণে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে, তার তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা যেতে পারে। অভিযোগ জানানোর জন্য সহজ ও কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে সাধারণ মানুষও এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবেন।
ঢাকার ফুটপাত কোনো ব্যক্তি, রাজনৈতিক গোষ্ঠী কিংবা ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি নগরবাসীর চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ গণপরিসর। অথচ দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাতের একটি অংশ অবৈধ দখল ও অর্থ আদায়ের অভিযোগে জর্জরিত।
এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ পথচারী। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ ফুটপাত ব্যবহার করতে না পেরে মূল সড়কে চলাচল করতে বাধ্য হন। এতে যানজট বাড়ে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং নগরজীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
তবে এই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে হকারদের জীবিকার বিষয়টি উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। কারণ, ফুটপাতের ব্যবসার সঙ্গে অসংখ্য পরিবার ও তাদের দৈনন্দিন জীবন-জীবিকা জড়িয়ে রয়েছে। তাই প্রকৃত হকারদের জন্য বৈধ ব্যবসার সুযোগ তৈরি এবং অবৈধভাবে অর্থ আদায়কারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা; দুটিই একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে।
ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে হলে ফুটপাত ফিরিয়ে দিতে হবে পথচারীদের, আর হকারদের দিতে হবে সম্মানজনক জীবিকার সুযোগ। উচ্ছেদ অভিযান নয়, প্রয়োজন সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং অবৈধ অর্থ আদায়ের নেটওয়ার্ক ভাঙতে না পারলে ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ বারবার ব্যর্থ হবে।
নগরবাসীর হাঁটার অধিকার এবং হকারদের বেঁচে থাকার অধিকার – দুটির মধ্যে সংঘাত নয়, সমন্বয়ই হতে পারে ঢাকার ফুটপাত সমস্যার স্থায়ী সমাধান।