দীর্ঘ তিন বছরের অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনার ফুটবলপ্রেমীদের। আবারও ফুটবলের উত্তেজনায় মুখর হতে যাচ্ছে দেশটির লা প্লাতায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী এস্তাদিও উনিকো ত্রিকাম্পেওনেস দেল মুন্দো-দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা স্টেডিয়াম। আগামী ২৯ নভেম্বর আর্জেন্টিনা ও জার্মানির নারী ফুটবল দলের মধ্যকার একটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে খুলতে যাচ্ছে স্টেডিয়ামটির দরজা। ২০২৭ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিতব্য নারী বিশ্বকাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এই ম্যাচে মুখোমুখি হবে দুই দল।
২০২৩ সালে সংস্কারকাজের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল স্টেডিয়ামটি। এরপর থেকে সেখানে কোনো ধরনের ক্রীড়া আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে ফুটবল থেকে দূরে থাকা এই ভেন্যুতে আবারও আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের খবরে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছে বাড়তি আগ্রহ। যদিও স্টেডিয়ামের সংস্কারকাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি, তবে আর্জেন্টিনা ও জার্মানির নারী দলের ম্যাচ দিয়ে নতুন করে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী এই মাঠ।
লা প্লাতায় অবস্থিত এই স্টেডিয়াম আর্জেন্টিনার ফুটবল অবকাঠামোর অন্যতম পরিচিত নাম। প্রয়াত কিংবদন্তি ফুটবলার দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার নামে নামকরণ করা ভেন্যুটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশটির ফুটবল ঐতিহ্য ও আবেগ। সংস্কারকাজের কারণে দীর্ঘদিন মাঠটি বন্ধ থাকায় সেখানে আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন সমর্থকরা। এবার সেই অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে নারী ফুটবলের হাত ধরে।
স্টেডিয়ামটির পরিচালক এবং আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) অনুষ্ঠান ও প্রটোকল কমিটির সভাপতি ফার্নান্দো ইসলাস কাসারেস জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত সংস্কারকাজের প্রায় ২৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। অর্থাৎ কাজের বড় একটি অংশ এখনো বাকি রয়েছে। তারপরও আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের মাধ্যমে স্টেডিয়ামটি আবারও ফুটবলের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কাসারেসের প্রত্যাশা, শুধু আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না এই ভেন্যুর ভবিষ্যৎ। ২০৩০ বিশ্বকাপেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে স্টেডিয়ামটি। তিনি জানান, সংস্কারকাজের এক-চতুর্থাংশ শেষ হয়েছে এবং তাদের বিশ্বাস, ২০৩০ বিশ্বকাপের অন্যতম ভেন্যু হিসেবে ব্যবহৃত হবে এটি। সে লক্ষ্য সামনে রেখেই চলছে সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম।
অন্যদিকে ২৯ নভেম্বরের ম্যাচটি শুধু একটি স্টেডিয়াম পুনরায় চালুর আয়োজন নয়, মাঠের লড়াইয়ের দিক থেকেও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, আর্জেন্টিনা ও জার্মানির নারী ফুটবল দল এর আগে মাত্র দুবার মুখোমুখি হয়েছে। দুই দলের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল ২০০৩ সালে। এরপর ২০০৭ সালের ফিফা নারী বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে আবারও একে অপরের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল তারা। দীর্ঘ বিরতির পর এবার তৃতীয়বারের মতো মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দুই দল।
বর্তমান ফিফা নারী র্যাঙ্কিংয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে জার্মানি। ফলে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী এই দলের বিপক্ষে খেলা আর্জেন্টিনার জন্য সহজ হবে না। বিশেষ করে ২০২৭ নারী বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নিজেদের শক্তি, দুর্বলতা ও খেলার মান যাচাই করার ক্ষেত্রে ম্যাচটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্বকাপের আগে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এমন ম্যাচ খেলতে পারলে দলের প্রস্তুতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আর্জেন্টিনার নারী দলের কোচ হেরমান পোর্তানোভাও ম্যাচটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। তার মতে, জার্মানির মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে খেলার সুযোগ নিজেদের সামর্থ্য যাচাইয়ের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রতিযোগিতামূলক মান বাড়াতে হলে নিয়মিত শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হওয়া প্রয়োজন। সেই বিবেচনায় ২৯ নভেম্বরের ম্যাচটি আর্জেন্টিনার জন্য বড় একটি পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
পোর্তানোভার কাছে ম্যাচটির গুরুত্ব আরও একটি কারণে আলাদা। সংস্কারের পর ঐতিহাসিক এই স্টেডিয়ামের পুনরায় উদ্বোধনের দিনে দলের দায়িত্বে থাকতে পারাকে তিনি বিশেষ অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন। নিজেদের দর্শকদের সামনে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলার সুযোগ খেলোয়াড়দের জন্যও বাড়তি অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।
জার্মানির নারী দলের কোচ ক্রিশ্চিয়ান ভুকও ম্যাচটি নিয়ে আশাবাদী। তার মতে, শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে মাঠে নামলে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা অর্জন এবং দলের সামগ্রিক উন্নতির ক্ষেত্রেও এ ধরনের ম্যাচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলাকে তিনি সেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই দেখছেন।
সব মিলিয়ে ২৯ নভেম্বরের ম্যাচটি আর্জেন্টিনা ও জার্মানির নারী দলের জন্য বিশ্বকাপ প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে যাচ্ছে। একদিকে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নিজেদের ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ, অন্যদিকে দীর্ঘ তিন বছর পর ঐতিহ্যবাহী একটি স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রত্যাবর্তন। দুই উপলক্ষ মিলিয়ে ম্যাচটি ঘিরে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
বিশেষ করে সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার যে স্বপ্ন দেখছে কর্তৃপক্ষ, সেই পথচলায় আর্জেন্টিনা-জার্মানি ম্যাচটি হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। সংস্কারকাজ শেষ হলে ভবিষ্যতে আরও বড় আন্তর্জাতিক আয়োজনের সাক্ষী হওয়ার অপেক্ষায় থাকবে দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা স্টেডিয়াম। দীর্ঘ বিরতির পর ২৯ নভেম্বরের ম্যাচ দিয়েই আবারও ফুটবলের আলোয় ফিরতে যাচ্ছে লা প্লাতার এই ঐতিহ্যবাহী ভেন্যু।