যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনায় বসতে ইরান প্রস্তুত রয়েছে। তবে দেশটির ওপর নতুন করে সামরিক হামলা হলে তা মোকাবিলায় তেহরান ‘পুরোপুরি প্রস্তুত’ বলেও জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা কূটনীতির জন্য প্রস্তুত। একই সঙ্গে যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত।’
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের সাত দিনের প্রস্তাব নিয়েও বিস্তারিত জানান আরাগচি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নিলে তেহরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে প্রস্তুত।
আরাগচির ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের প্রস্তাবের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে যুদ্ধ বন্ধ, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড়, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানকে তেল বিক্রির সুযোগ দেওয়ার মতো কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে। এসব পদক্ষেপ নেওয়া হলে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কথা জানিয়েছে তেহরান।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো নিতে পারে। এরপর ষষ্ঠ দিনে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে এবং সপ্তম দিনে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে দুই দেশের আলোচনা পুনরায় শুরু হতে পারে।
আরাগচি জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন; এমন কথা তেহরান শুনেছে। তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক জবাবের জন্য ইরান এখনো অপেক্ষা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে ইরানের গভীর অবিশ্বাস রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন আরাগচি। তার অভিযোগ, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়েছে এবং একটি চুক্তি স্বাক্ষরের পরও সেটি লঙ্ঘন করেছে।
তবে কূটনীতির সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি বলে জানান তিনি।
আরাগচি বলেন, ‘কূটনীতির জন্য সবসময়ই আশা থাকে। আমি এখনো কূটনীতির চেষ্টা করছি, কারণ শান্তির কোনো সুযোগই আমাদের হাতছাড়া করা উচিত নয়।’
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তিনি বিশ্বাস করেন কি না। এমন প্রশ্নের জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা নিজেদের বিশ্বাস করি।’
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরান জুনের সমঝোতা স্মারক প্রথম লঙ্ঘন করেছিল। এমন অভিযোগও নাকচ করেন আরাগচি। তার দাবি, ওয়াশিংটন যদি মনে করত তেহরান চুক্তি লঙ্ঘন করেছে, তাহলে অন্তর্বর্তী সমঝোতায় থাকা বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা ব্যবহার করতে পারত। এর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র আবার সামরিক হামলা চালাতে পারে কি না। এমন প্রশ্নে আরাগচি বলেন, আগের সংঘাত থেকে ইরান শিক্ষা নিয়েছে এবং নিজেদের সামরিক কৌশলে পরিবর্তন এনেছে।
তিনি বলেন, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তা মোকাবিলায় ইরান প্রস্তুত রয়েছে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের পথও খোলা রাখতে চায় তেহরান।
আরাগচির ভাষ্য, নতুন করে সামরিক অভিযান চালানো হবে, নাকি আলোচনার পথে যাওয়া হবে। সেই সিদ্ধান্ত এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও আলোচনার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন আরাগচি। তার দাবি, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে এবং এর একটি অংশ চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য।
তিনি জানান, ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়াম নিয়ে আলোচনার প্রস্তাবও ইরান দিয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে সাত দিনের প্রাথমিক প্রস্তাবে পারমাণবিক ইস্যুটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
আরাগচির মতে, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পরবর্তী পর্যায়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আপাতত দুই পক্ষের মধ্যে আস্থা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মার্চে ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রকাশ্য ভিডিওতে দেখা না যাওয়ার বিষয়েও সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করা হয় আরাগচিকে।
জবাবে তিনি নিরাপত্তাজনিত কারণের কথা উল্লেখ করেন। তার দাবি, সর্বোচ্চ নেতার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি থাকার বিষয়ে ইরানের কাছে কিছু তথ্য রয়েছে।
আরাগচি বলেন, সর্বোচ্চ নেতার ‘মন্তব্য, নির্দেশনা ও মতামত’ তারা নিয়মিত পাচ্ছেন।
ইরানে ক্ষমতার একাধিক কেন্দ্র তৈরি হয়েছে; এমন ধারণাও নাকচ করেন তিনি। তার দাবি, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরকার, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি), সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এবং পার্লামেন্টের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি