এশিয়ার ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর এএফসি এশিয়ান কাপ। মহাদেশের ২৪টি জাতীয় দলের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতাকে ঘিরে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছিল প্রস্তুতি। ২০২৭ সালের আসরটি আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছিল সৌদি আরব। দেশটির বিভিন্ন শহরে টুর্নামেন্ট আয়োজনের প্রস্তুতিও চলছিল পুরোদমে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সংকট ও একের পর এক প্রাণঘাতী হামলার ঘটনায় পাল্টে গেছে সব পরিকল্পনা। পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্ধারিত সময় থেকে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে এশিয়ান কাপের পরবর্তী আসর।
আগের সূচি অনুযায়ী ২০২৭ সালের ৭ জানুয়ারি শুরু হওয়ার কথা ছিল এশিয়ার ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। এক মাসের এই প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার কথা ছিল ৫ ফেব্রুয়ারি। তবে নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, টুর্নামেন্টটি আর জানুয়ারির শুরুতে মাঠে গড়াচ্ছে না। পরিবর্তিত সূচিতে ২০২৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর শুরু হবে প্রতিযোগিতা। ফাইনালসহ পুরো আসর শেষ হবে ২০২৮ সালের ২১ জানুয়ারি। অর্থাৎ নতুন সূচিতে টুর্নামেন্টটি গড়াবে দুই ক্যালেন্ডার বছরজুড়ে।
এশিয়ান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এক বিবৃতিতে সূচি পরিবর্তনের বিষয়টি জানিয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এবং এর ফলে তৈরি হওয়া বিভিন্ন জটিলতা বিবেচনায় নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে নিরাপত্তা উদ্বেগের পাশাপাশি যাতায়াত ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য সমস্যাগুলো আয়োজকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
এএফসির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘অঞ্চলের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট বিশেষ পরিস্থিতি, বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য লজিস্টিক জটিলতা ও যাতায়াত বিঘ্নের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে টুর্নামেন্টের সূচি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।’
তবে নতুন সূচি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে আরও একটি আনুষ্ঠানিকতা বাকি রয়েছে। এএফসি জানিয়েছে, পরিবর্তিত সূচি অনুমোদনের জন্য ফিফার কাছে পাঠানো হবে। ফিফার অনুমোদন পাওয়ার পরই নতুন সময়সূচি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে। ফলে টুর্নামেন্ট আয়োজনের ক্ষেত্রে আপাতত নতুন সময় ধরে প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সংশ্লিষ্টরা।
সৌদি আরবে এশিয়ান কাপ আয়োজন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার পেছনে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতা। অঞ্চলটিতে একের পর এক হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে ঘিরে নিরাপত্তার বিষয়টি এখন আলোচনায় এসেছে।
এর আগে গত অক্টোবরে ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনের চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় রিয়াদ বিমানবন্দরে ১৩ জন নিহত হওয়ার খবর সামনে আসে। ওই ঘটনায় আহত হন তিন শতাধিক মানুষ। এমন একটি হামলার পর সৌদি আরবের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক যাতায়াতের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় কোনো ক্রীড়া আয়োজন করতে হলে খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, সমর্থক ও সংশ্লিষ্ট সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। সেই বিবেচনায় এশিয়ান কাপের মতো বড় প্রতিযোগিতা আয়োজনের সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে।
এশিয়ান কাপ শুধু একটি ফুটবল প্রতিযোগিতা নয়, এটি এশিয়ার ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম বড় আন্তর্জাতিক আয়োজন। এখানে অংশ নেয় মহাদেশের সেরা জাতীয় দলগুলো। প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার সমর্থক আয়োজক দেশে ভ্রমণ করেন। খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফের পাশাপাশি সংবাদকর্মী, সম্প্রচারকর্মী, কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদেরও উপস্থিতি থাকে। ফলে আয়োজনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ব্যাহত হলে দলগুলোর যাতায়াত পরিকল্পনায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে হোটেল, অনুশীলন মাঠ, স্টেডিয়াম এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নির্ধারিত সময় পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে বড় আয়োজনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই দেখছে সংশ্লিষ্ট মহল।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাব শুধু ফুটবলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। সৌদি আরবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অন্যান্য ক্রীড়া আয়োজনও পরিস্থিতির কারণে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। সম্প্রতি রাজধানী রিয়াদে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা টেনিসের প্রদর্শনীমূলক প্রতিযোগিতা ‘সিক্স কিংস স্ল্যাম’ বাতিল করা হয়েছে। বিশ্বের তারকা টেনিস খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণে এই আয়োজন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতাটি আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।
এর আগে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে সৌদি আরব নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে বিভিন্ন বড় প্রতিযোগিতা আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছিল। ফুটবল, টেনিসসহ একাধিক খেলায় দেশটির বিনিয়োগ ও আয়োজন নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা হয়েছে। এশিয়ান কাপও সেই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে আঞ্চলিক অস্থিরতা বড় আয়োজনগুলোর ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
এশিয়ান কাপের সূচি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটি প্রতিযোগিতার তারিখ বদলের ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের নিরাপত্তা, যাতায়াত ব্যবস্থা এবং অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রস্তুতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এশিয়ান কাপের নতুন সময়সূচির কারণে অংশগ্রহণকারী ২৪টি দলকেই নিজেদের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হবে। জাতীয় দলগুলোর আন্তর্জাতিক ম্যাচের সূচি, খেলোয়াড়দের বিশ্রাম, অনুশীলন ক্যাম্প এবং প্রস্তুতি ম্যাচ আয়োজনের ক্ষেত্রে নতুন করে হিসাব করতে হবে। বিশেষ করে ইউরোপসহ বিভিন্ন বিদেশি লিগে খেলা ফুটবলারদের নিয়ে দল গঠনের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসতে পারে।
আগের সূচি অনুযায়ী জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার কথা থাকায় দলগুলো সেই হিসাবেই নিজেদের প্রস্তুতি সাজাচ্ছিল। এখন ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ায় ক্লাব ফুটবলের ব্যস্ত সূচির সঙ্গে জাতীয় দলের প্রস্তুতির সমন্বয় করতে হবে। খেলোয়াড়দের ক্লাব থেকে ছাড়পত্র পাওয়া, জাতীয় দলে যোগ দেওয়া এবং টুর্নামেন্ট শুরুর আগে পর্যাপ্ত অনুশীলনের সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এ ছাড়া সমর্থকদের ভ্রমণ পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আনতে হবে। যারা আগে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির সময় ধরে সৌদি আরবে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, তাদের নতুন তারিখ অনুযায়ী বিমান টিকিট, হোটেল বুকিং এবং অন্যান্য ব্যবস্থাপনা ঠিক করতে হবে। একইভাবে সম্প্রচার সংস্থা, স্পনসর এবং আয়োজক প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
আয়োজকদের জন্যও কাজের পরিধি কম নয়। স্টেডিয়াম প্রস্তুত রাখা, নিরাপত্তা পরিকল্পনা নতুন করে সাজানো, দর্শকদের প্রবেশ ও চলাচল নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক দলগুলোর আবাসন ও যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে হবে। নতুন সূচি অনুযায়ী সবকিছু সমন্বয় করতে বাড়তি সময় ও পরিকল্পনার প্রয়োজন হবে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ২০২৭ এশিয়ান কাপের আয়োজনকে নতুন বাস্তবতার মুখে দাঁড় করিয়েছে। ২৪টি দেশের অংশগ্রহণে মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন। ৭ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারির পরিবর্তে প্রতিযোগিতাটি শুরু হবে ২৩ ডিসেম্বর এবং শেষ হবে ২০২৮ সালের ২১ জানুয়ারি।
তবে নতুন সূচি কার্যকর হওয়ার আগে ফিফার অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ। সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের প্রস্তুতি নতুন সময়সূচি অনুযায়ী সাজাতে পারবে।
এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সৌদি আরবের জন্য নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা। কারণ এশিয়ান কাপের মতো বড় আসরে শুধু মাঠের লড়াই নয়, মাঠের বাইরের ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। খেলোয়াড় থেকে শুরু করে সমর্থক—সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলেই সফলভাবে আয়োজন করা সম্ভব হবে এশিয়ার ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই প্রতিযোগিতা।