বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর সম্প্রসারণে মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে আরও ১১টি বিমান কেনার বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফরের সময় এ চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে।
নিউইয়র্ক সময় বুধবার বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে – বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত ২টা ১৫ মিনিটে – চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের সূচি নির্ধারিত রয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের উপস্থিতিতে বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন। এরপর বোয়িংয়ের গ্লোবাল প্রেসিডেন্ট ড. ব্রেন্ডন নেলসন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের চলমান কর্মসূচিতে নতুন এই চুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ফলে বোয়িংয়ের কাছ থেকে বিমানের প্রস্তাবিত উড়োজাহাজ সংগ্রহের সংখ্যা ১৪ থেকে বেড়ে ২৫টিতে দাঁড়াবে।
আগের ১৪ বিমানের চুক্তি
এর আগে গত ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। ওই চুক্তির আনুমানিক তালিকামূল্য ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। চুক্তির আওতায় রয়েছে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স উড়োজাহাজ।
ওই চুক্তিকে বিমানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বহর সম্প্রসারণের উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রথম উড়োজাহাজটি ২০৩১ সালের নভেম্বরে সরবরাহের কথা রয়েছে। বাকি উড়োজাহাজগুলো পর্যায়ক্রমে ২০৩৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বোয়িং জানিয়েছে, নতুন ৭৮৭-১০ উড়োজাহাজগুলো বিশেষ করে উচ্চ চাহিদার আন্তর্জাতিক রুটে ব্যবহারের উপযোগী। অন্যদিকে ৭৮৭-৯ উড়োজাহাজ দীর্ঘপাল্লার ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার রুটে ব্যবহারের জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছে। ৭৩৭-৮ ম্যাক্স বিমানের মাধ্যমে আঞ্চলিক রুটে সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
নতুন ১১ বিমানের তথ্য এখনো প্রকাশ হয়নি
তবে নতুন করে যে ১১টি বিমান কেনার চুক্তি হতে যাচ্ছে, সেগুলোর মডেল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। একইভাবে এসব বিমানের মোট মূল্য, অর্থায়নের কাঠামো এবং সরবরাহের সময়সূচিও প্রকাশ করা হয়নি। ফলে নতুন ১১টি বিমানের ধরন বা সম্ভাব্য খরচ নিয়ে এখনই নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়ার সুযোগ নেই।
২০ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরের কর্মসূচি পরিবর্তনশীল এবং নতুন কর্মসূচি যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তখন অতিরিক্ত বোয়িং চুক্তির বিষয়ে নির্দিষ্ট ঘোষণা না দিলেও তিনি বলেন, সফরের কর্মসূচিতে নতুন বিষয় যুক্ত হতে পারে।
পরবর্তীতে অতিরিক্ত ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি সামনে আসে। এর আগে আগস্টের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও বাংলাদেশ অতিরিক্ত বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। এমন বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশি কর্মকর্তারা অবশ্য জানিয়েছিলেন, উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত দেশের বিমান পরিবহন খাতের প্রয়োজনের ভিত্তিতেই নেওয়া হবে।
বোয়িং-এয়ারবাস প্রতিযোগিতার মধ্যে নতুন সিদ্ধান্ত
বিমানের বহর সম্প্রসারণকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন বোয়িং এবং ইউরোপের এয়ারবাসের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। ৩০ এপ্রিলের ১৪টি উড়োজাহাজের চুক্তির পর বোয়িংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। একই সময়ে এয়ারবাসের পক্ষ থেকেও বিমানের বহরে উড়োজাহাজ যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা চলছিল।
এর আগে বিমানের বহর সম্প্রসারণে ১০টি এয়ারবাস উড়োজাহাজ সংগ্রহের পরিকল্পনার কথাও আলোচনায় এসেছিল। প্রস্তাবিত ওই বহরে চারটি এ৩৫০-৯০০ এবং ছয়টি এ৩২১নিও উড়োজাহাজের কথা বলা হয়েছিল। ফলে বোয়িংয়ের ২৫টি এবং এয়ারবাসের সম্ভাব্য ১০টি উড়োজাহাজ মিলিয়ে বিমানের ভবিষ্যৎ বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজ পর্যন্ত যেতে পারে।
বহর আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ
বিমান বাংলাদেশ বর্তমানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটে বোয়িংয়ের ৭৮৭ ড্রিমলাইনার, ৭৭৭ এবং ৭৩৭ সিরিজের উড়োজাহাজ পরিচালনা করছে। এপ্রিলের চুক্তির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ৭৮৭-১০ ও ৭৩৭ ম্যাক্স যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। বোয়িংয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন প্রজন্মের এসব উড়োজাহাজ আগের প্রজন্মের উড়োজাহাজের তুলনায় জ্বালানি ব্যবহারে বেশি দক্ষ এবং যাত্রী ও কার্গো পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে।
বিমান কর্তৃপক্ষের বহর সম্প্রসারণ পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক রুটে সক্ষমতা বৃদ্ধি, পুরোনো উড়োজাহাজের পরিবর্তে আধুনিক বিমান যুক্ত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে যাত্রী ও কার্গো পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানো।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৪টি উড়োজাহাজের আগের চুক্তির সঙ্গে আরও ১১টি যুক্ত হলে বোয়িংয়ের কাছ থেকে বিমানের মোট সম্ভাব্য উড়োজাহাজ সংগ্রহ দাঁড়াবে ২৫টি। তবে এসব উড়োজাহাজ কবে নাগাদ বহরে যুক্ত হবে, কোন কোন মডেল থাকবে এবং মোট আর্থিক ব্যয় কত হবে—এসব বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের পর বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
নিউইয়র্ক সফরের ব্যস্ত কর্মসূচির মধ্যে চুক্তি
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। অধিবেশনের ফাঁকে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিভিন্ন কর্মসূচিতেও তাঁর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
এর মধ্যেই বোয়িংয়ের সঙ্গে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক ও বিমান পরিবহন সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর বোয়িংয়ের গ্লোবাল প্রেসিডেন্ট ড. ব্রেন্ডন নেলসনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাতের কর্মসূচিও রয়েছে।
সব মিলিয়ে নতুন ১১টি উড়োজাহাজ যুক্ত হলে বিমানের দীর্ঘমেয়াদি বহর সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় বোয়িংয়ের অংশ আরও বাড়বে। তবে নতুন চুক্তির আর্থিক ও কারিগরি শর্তগুলো প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এর মোট ব্যয়, উড়োজাহাজের নির্দিষ্ট মডেল এবং সরবরাহের সময়সীমা সম্পর্কে চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।