তাওহিদ হৃদয়ের অবিশ্বাস্য ডাবল সেঞ্চুরিতে ব্যাট হাতে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ। মনে হচ্ছিল, সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই বল হাতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে চাপে ফেলবে স্বাগতিকেরা। কিন্তু মাঠের চিত্র হলো সম্পূর্ণ উল্টো। বাংলাদেশের বোলারদের হতাশ করে চতুর্থ দিনের প্রায় পুরোটা সময় দাপট দেখাল ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যানরা। উইকেটের দেখা খুব একটা না পেলেও রান তুলেছেন সাবলীল গতিতে। দিন শেষে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই নিজেদের হাতে নিয়ে নিয়েছে সফরকারীরা।
সিলেট টেস্টের চতুর্থ দিন শেষে দ্বিতীয় ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ ৩ উইকেটে ৩৪৫ রান। বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের চেয়ে তারা এগিয়ে আছে ৩১৫ রানে। ফলে শেষ দিনে জয়ের জন্য বাংলাদেশকে যেমন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তেমনি ম্যাচ বাঁচানোর লড়াইটাও হয়ে উঠেছে বেশ চ্যালেঞ্জিং।
গতকাল তাওহিদ হৃদয়ের ব্যাটে ভর করে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ। তাঁর অসাধারণ ডাবল সেঞ্চুরিতে প্রথম ইনিংসে লিড নেওয়ার পাশাপাশি ম্যাচে ফেরার আত্মবিশ্বাসও পেয়েছিল দল। কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা গেল না বোলিংয়ে। বরং দ্বিতীয় ইনিংসের শুরু থেকেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যানদের সামনে অসহায় মনে হয়েছে বাংলাদেশের বোলারদের।
প্রথম উইকেটে ৮৫ রান যোগ করেন তাঁরা। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশের বোলারদের চাপে রাখেন দুই ব্যাটসম্যান। শেষ পর্যন্ত তাইজুল ইসলামের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন দা সিলভা। তাঁর ব্যাট থেকে আসে ৩৬ রান।
এরপরও থামেনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান তোলার গতি। ব্র্যান্ডন কিং একপ্রান্ত আগলে রেখে খেলেছেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। ৮৪ বলে ৬১ রানের ইনিংসে ছিল ১০টি চার ও একটি ছক্কা। মেহেদী হাসান মিরাজের বলে স্লিপে নাজমুল হোসেন শান্তর হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন এই ওপেনার। ১১৯ রানে দ্বিতীয় উইকেট হারায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
দুই উইকেট তুলে নিয়ে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু এরপরই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেন কাভেম হজ ও অভিষিক্ত কেভিন উইকহাম।

বিশেষ করে অভিষেক টেস্ট খেলতে নামা উইকহামের ব্যাটিং ছিল প্রশংসনীয়। নিজের প্রথম টেস্টেই দুই ইনিংসে দুটি অর্ধশতক তুলে নিয়েছেন তিনি। দ্বিতীয় ইনিংসে ১০৭ বলে ৭৮ রান করে তাইজুল ইসলামের বলেই ফিরে যান এই ব্যাটসম্যান। তাঁর ইনিংসে ছিল সাতটি চার ও দুটি ছক্কা।
অন্যদিকে একপ্রান্তে অবিচল ছিলেন হজ। উইকহাম ফিরে যাওয়ার পরও তাঁর ব্যাটিংয়ে কোনো ছন্দপতন ঘটেনি। বরং ধৈর্য ও আক্রমণের দারুণ সমন্বয়ে বাংলাদেশের বোলারদের আরও হতাশ করেছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ১৮৯ বলে ১৪০ রানে অপরাজিত থেকে দিন শেষ করেন এই ব্যাটসম্যান। তাঁর ইনিংসে ছিল ১৭টি চার ও একটি ছক্কা। এটি হজের টেস্ট ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরি।
দিনের শেষ দিকে আমির জাঙ্গুকে নিয়ে আরও ৬১ রান যোগ করেন হজ। ৪৯ বলে ২০ রান করে অপরাজিত আছেন জাঙ্গু। প্রথম ইনিংসেও ১৩৩ রানের দারুণ ইনিংস খেলেছিলেন তিনি।
সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে ধারাবাহিকতা ও নিয়ন্ত্রণের অভাবে। দিনের বেশির ভাগ সময় স্পিনারদের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তকে। কিন্তু উইকেট থেকে প্রত্যাশিত টার্ন ও বাউন্স না পাওয়ার পাশাপাশি লাইন-লেংথেও ধারাবাহিকতা রাখতে পারেননি বোলাররা।
তাইজুল ইসলাম ২৯ ওভার বল করে ১১৮ রান দিয়ে নিয়েছেন ২ উইকেট। মেহেদী হাসান মিরাজ ২২ ওভারে ৫৮ রান দিয়ে পেয়েছেন ১ উইকেট। অন্যদিকে তাসকিন আহমেদ ১১ ওভারে ৫১ এবং হাসান মাহমুদ ১১ ওভারে ৬১ রান খরচ করলেও কোনো উইকেট পাননি। নাঈম হাসানও ১০ ওভার বল করে ৪৮ রান দিয়ে উইকেটশূন্য থেকেছেন।
অর্থাৎ পাঁচ বোলারের মধ্যে উইকেট পেয়েছেন মাত্র দুজন। প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের চাপে ফেলার মতো বোলিং করতে না পারায় দিন যত গড়িয়েছে, ম্যাচ থেকে ততই পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ।
মাঠের খেলায় হতাশার পাশাপাশি দিনের শেষ দিকে তৈরি হয় কিছুটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতিও। বাংলাদেশের অধিনায়কত্ব করা লিটন দাসের শরীরে বল লাগার পর ফিজিও মাঠে আসেন। তাঁর চিকিৎসার জন্য কিছু সময় খেলা বন্ধ থাকে। এর আগে মেহেদী হাসান মিরাজের আঙুলে চোট লাগলেও মাঠে চিকিৎসা নিতে দেখা যায় তাঁকে।
খেলা বন্ধ থাকার এসব মুহূর্তে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রধান কোচ ড্যারেন স্যামিকে হাসতে দেখা যায়। এমনকি লিটনের অঙ্গভঙ্গি অনুকরণ করেও মজা করেন তিনি। ধারাভাষ্যকারেরাও বিষয়টি নিয়ে রসিকতা করেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও বাংলাদেশের সময়ক্ষেপণের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
চতুর্থ দিনের খেলা শেষ হওয়ার পর ম্যাচের চিত্র ওয়েস্ট ইন্ডিজের পক্ষেই স্পষ্টভাবে হেলে পড়েছে। ৩১৫ রানের লিড নিয়ে শেষ দিনে ব্যাটিং চালিয়ে গেলে বাংলাদেশের জন্য লক্ষ্যটা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। আর ইনিংস ঘোষণা করে দিলেও সেই রান তাড়া করা সহজ হবে না।
টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সফল রান তাড়া করার রেকর্ড ২১৫ রানের। ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেই সেই লক্ষ্য পেরিয়ে জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। এবার সিলেটে জিততে হলে নিজেদের সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে হবে।
একদিকে সিরিজে সমতা ফেরানোর স্বপ্ন, অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জয়ের হাতছানি। শেষ দিনে তাই বাংলাদেশের সামনে লড়াইটা শুধু রান তোলার নয়, নিজেদের সামর্থ্য ও মানসিক দৃঢ়তা প্রমাণেরও। হৃদয়ের ব্যাটে যে স্বপ্নের শুরু হয়েছিল, সেই স্বপ্নের শেষটা কীভাবে হয়, এখন সেটিই দেখার অপেক্ষা।
তথ্যসূত্র: আইসিসি ম্যাচ রিপোর্ট ও বাসসের প্রতিবেদন।