বাংলাদেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর মানবাধিকার সুরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি বিএনপি দিয়েছিল, ক্ষমতায় যাওয়ার পর সরকার তা রক্ষা করতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
বুধবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, সেপ্টেম্বর মাসে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া তিনটি আইন বাংলাদেশের মানবাধিকার সুরক্ষার বিদ্যমান ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। এই আইনগুলো হলো -জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০২৬, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৬ এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠনের আইন।
এইচআরডব্লিউর দাবি, এসব আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া কিছু মানবাধিকার সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা বাতিল বা দুর্বল করা হয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
এইচআরডব্লিউ বলছে, ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করতে একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। ওই কাঠামোর আওতায় কমিশন নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত, আটককেন্দ্র পরিদর্শন এবং গুমের ঘটনা প্রতিরোধ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাড়তি ক্ষমতা পেয়েছিল।
তবে নতুন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০২৬ এ এসব ক্ষমতার কিছু অংশ আর রাখা হয়নি বলে দাবি করেছে সংস্থাটি। নতুন আইনে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে কমিশন সরাসরি তদন্ত করতে পারবে না; সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা সরকারের কাছে প্রতিবেদন চাওয়ার সুযোগই প্রধানত রাখা হয়েছে। কোনো বাহিনীর প্রতিবেদন সন্তোষজনক না হলে কমিশনের নিজস্ব তদন্তের সুযোগ রয়েছে। তবে এ বিধানটি অস্পষ্ট বলে মনে করছে এইচআরডব্লিউ।
সংস্থাটির আরও দাবি, কমিশনের সদস্য নিয়োগ, অর্থায়ন ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও নতুন আইনে আগের অধ্যাদেশের তুলনায় নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বাড়ার সুযোগ রয়েছে।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন- ২০২৬ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটির মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গুমের অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত এবং এ ধরনের ঘটনায় জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, নতুন আইনে তা পরিবর্তন করা হয়েছে।
বিশেষ করে কমান্ড রেসপনসিবিলিটির ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার বিষয়টি উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। তাদের দাবি, আগের কাঠামোয় কোনো কর্মকর্তা কোনো লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতেন বা জানা উচিত ছিল এবং তা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেননি। এমন পরিস্থিতিতেও দায় নির্ধারণের সুযোগ ছিল। নতুন আইনে কোনো কমান্ডিং কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায় প্রতিষ্ঠায় সরাসরি নির্দেশ দেওয়ার প্রমাণের প্রয়োজন হবে।
এর ফলে গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দায় নির্ধারণ কঠিন হতে পারে বলে মনে করছে এইচআরডব্লিউ।
এর আগে জুলাই মাসে সংস্থাটি বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম সম্ভাব্য গুমের ঘটনা হিসেবে মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে উদ্বেগ জানিয়েছিল। ওই সময়ও এইচআরডব্লিউ নতুন সরকারের প্রতি নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছিল।
র্যাব বিলুপ্ত করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠনের আইন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হওয়া আইনের মাধ্যমে র্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে নতুন বিশেষায়িত বাহিনী এসআরবি গঠন করা হয়। তবে এইচআরডব্লিউর দাবি, র্যাবের জনবল, ক্ষমতা, সম্পদ, নথি ও অন্যান্য অবকাঠামো নতুন বাহিনীতে স্থানান্তর করা হয়েছে। ফলে নাম পরিবর্তন হলেও কাঠামোগতভাবে আগের বাহিনীর সঙ্গে এর বড় ধরনের ধারাবাহিকতা রয়ে গেছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
র্যাবের বিরুদ্ধে অতীতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও নির্যাতনের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছিল। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাব ও এর কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। এইচআরডব্লিউ বলছে, নতুন বাহিনী গঠনের ক্ষেত্রে কার্যকর ও স্বাধীন নজরদারি এবং জবাবদিহির যথেষ্ট ব্যবস্থা না থাকলে অতীতের সমস্যাগুলো নতুন বাহিনীতেও ফিরে আসার ঝুঁকি রয়েছে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া বিভাগের পরিচালক এলেন পিয়ারসন বলেন, অতীতের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বাংলাদেশের প্রকৃত নিরাপত্তা খাত সংস্কার এবং অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতাসম্পন্ন একটি স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন প্রয়োজন।
তার ভাষ্য, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে গুম ও হত্যার মতো ঘটনা ভবিষ্যতে পুরোপুরি বন্ধ রাখার নিশ্চয়তা তৈরি হবে না।
এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলে এইচআরডব্লিউ বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা মানবাধিকার কমিশন ও গুম-সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো দ্রুত আইনে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছিল। সংস্থাটির মতে, ওই অধ্যাদেশগুলো মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের ক্ষমতা বাড়িয়েছিল।
এইচআরডব্লিউর সর্বশেষ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নতুন আইনগুলো মানবাধিকার সুরক্ষায় পূর্ববর্তী সংস্কার উদ্যোগ থেকে পিছিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা বক্তব্য পাওয়া গেছে কি না, তা বিবৃতি প্রকাশের সময় পর্যন্ত স্পষ্ট নয়।
/বিবিসি