বাংলাদেশসহ ১৯টি দেশ ও অঞ্চলের নির্দিষ্ট শ্রেণির বিশেষায়িত ওষুধ ও সংশ্লিষ্ট উপাদানের ওপর শূন্য শতাংশ শুল্ক সুবিধা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বাণিজ্য বিভাগের ব্যুরো অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড সিকিউরিটি (বিআইএস) ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে শূন্য শুল্কের আওতাভুক্ত ওষুধের ধরন এবং যোগ্য দেশ ও অঞ্চলের তালিকা প্রকাশ করেছে। নতুন শুল্ক কাঠামোটি ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে।
বিআইএসের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এ সুবিধা সব ধরনের ওষুধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিমালায় নির্ধারিত বিশেষায়িত ওষুধ এবং সেগুলোর সংশ্লিষ্ট উপাদান নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে শূন্য শুল্কে দেশটির বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে।
যেসব ওষুধে মিলবে শূন্য শুল্ক
শূন্য শুল্ক সুবিধার আওতায় রাখা হয়েছে বিরল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত নির্দিষ্ট ওষুধ, নিউক্লিয়ার মেডিসিন, রক্তের প্লাজমা থেকে উৎপাদিত চিকিৎসা, বন্ধ্যত্বের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ, সেল থেরাপি, জিন থেরাপি এবং অ্যান্টিবডি-ড্রাগ কনজুগেট।
এর পাশাপাশি রাসায়নিক, জৈবিক, তেজস্ক্রিয় ও পারমাণবিক – অর্থাৎ CBRN – হুমকি মোকাবিলায় ব্যবহৃত চিকিৎসা পণ্য এবং প্রাণিচিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যও এই সুবিধার আওতায় রয়েছে। এসব পণ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট উপাদানও শূন্য শুল্কের সুবিধা পেতে পারে।
বিআইএসের সংজ্ঞা অনুযায়ী, বিরল রোগের ওষুধ বলতে এমন ওষুধ বা বায়োলজিক্যাল পণ্য বোঝানো হয়েছে, যার অনুমোদিত ব্যবহারগুলো বিরল রোগ বা অবস্থার চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত। নিউক্লিয়ার মেডিসিনের ক্ষেত্রে তেজস্ক্রিয় ওষুধ বা সংশ্লিষ্ট বায়োলজিক্যাল পণ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্লাজমা-ভিত্তিক চিকিৎসা বলতে মানব রক্ত বা প্লাজমা থেকে উৎপাদিত বায়োলজিক্যাল পণ্যকে বোঝানো হয়েছে।
সেল থেরাপির মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সেলুলার ইমিউনোথেরাপি, সেলুলার ক্যানসার ভ্যাকসিন এবং অন্যান্য চিকিৎসামূলক সেলুলার পণ্য রয়েছে। জিন থেরাপির আওতায় এমন পণ্য রয়েছে, যা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে জিনের প্রকাশ বা জীবন্ত কোষের জৈবিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন বা নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে অ্যান্টিবডি-ড্রাগ কনজুগেট হলো অ্যান্টিবডি বা অ্যান্টিবডির অংশের সঙ্গে একটি ওষুধকে রাসায়নিক লিংকের মাধ্যমে যুক্ত করে তৈরি চিকিৎসা পণ্য।
কোন কোন দেশ ও অঞ্চল তালিকায়
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের প্রকাশিত তালিকায় রয়েছে – আর্জেন্টিনা, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ইকুয়েডর, এল সালভাদর, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, গুয়াতেমালা, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, জর্ডান, মালয়েশিয়া, উত্তর মেসিডোনিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সুইজারল্যান্ড ও লিশটেনস্টাইন, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য এবং ভিয়েতনাম।
অর্থাৎ বাংলাদেশের পাশাপাশি এশিয়া, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ এবং অঞ্চল এ সুবিধার আওতায় এসেছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে যোগ্য jurisdiction-এর তালিকায় পরিবর্তন আনা হতে পারে।
কেন এই শুল্কছাড়
এই শূন্য শুল্ক ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ২ এপ্রিল ২০২৬-এর Proclamation 11020-এর মাধ্যমে। ওই ঘোষণায় নির্দিষ্ট পেটেন্টযুক্ত ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য ও সংশ্লিষ্ট উপাদানের ওপর ১০০ শতাংশ ad valorem শুল্ক আরোপের ব্যবস্থা করা হয়। প্রথম পর্যায়ে কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ৩১ জুলাই থেকে এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে এ শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
মার্কিন প্রশাসনের ঘোষণায় ওষুধ ও সংশ্লিষ্ট উপাদান আমদানিকে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশে ওষুধ উৎপাদন বাড়ানো এবং সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আমদানি নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
তবে বিশেষায়িত ওষুধের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। কোনো পণ্য এমন jurisdiction থেকে এলে, যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বা সম্ভাব্য বাণিজ্য ও নিরাপত্তা কাঠামো চুক্তি রয়েছে, সেটি নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে শূন্য শুল্ক সুবিধা পেতে পারে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি স্বাস্থ্যচাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত ওষুধও শূন্য শুল্কের জন্য বিবেচিত হতে পারে।
জরুরি স্বাস্থ্যচাহিদার ওষুধে আলাদা সুযোগ
শুধু তালিকাভুক্ত দেশগুলোর পণ্যই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি স্বাস্থ্যচাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় কিছু বিশেষায়িত ওষুধের ক্ষেত্রেও শূন্য শুল্কের জন্য আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিআইএস জানিয়েছে, কোনো কোম্পানি এ ধরনের সুবিধার জন্য আবেদন করলে পণ্যের নাম, সক্রিয় উপাদান, পণ্যের শ্রেণি, উৎপাদনের দেশ, রপ্তানির দেশ, আমদানিকারক ও প্রস্তুতকারকের তথ্য দিতে হবে। একই সঙ্গে কেন ওই পণ্যটি যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি স্বাস্থ্যচাহিদা পূরণে প্রয়োজন, তার ব্যাখ্যাও দিতে হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট রোগের চিকিৎসায় বিকল্প ব্যবস্থা আছে কি না, যুক্তরাষ্ট্রে কত রোগী ওই পণ্য ব্যবহার করেন এবং পণ্যটি অন্য কোথাও পাওয়া যায় কি না; এসব তথ্যও চাওয়া হতে পারে।
সাধারণ জেনেরিক ওষুধের ক্ষেত্রে কী হবে
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো; নতুন Section 232 pharmaceutical tariff সাধারণ জেনেরিক ওষুধ ও সংশ্লিষ্ট উপাদানের ওপর বর্তমানে প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ ১০০ শতাংশ শুল্কের মূল কাঠামোটি নির্দিষ্ট পেটেন্টযুক্ত ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য ও সংশ্লিষ্ট উপাদানকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে; জেনেরিক ওষুধ এই Section 232 শুল্কের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
ফলে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সিদ্ধান্তটি বুঝতে হলে ‘সব ওষুধে শুল্কছাড়’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং নির্ধারিত বিশেষায়িত ওষুধ, সংশ্লিষ্ট উপাদান এবং নির্দিষ্ট শর্তের আওতায় থাকা পণ্যের ক্ষেত্রেই শূন্য শুল্ক সুবিধা প্রযোজ্য হবে। একইভাবে কোনো পণ্য তালিকায় থাকা দেশ থেকে রপ্তানি হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব ধরনের ওষুধ শুল্কমুক্ত হবে না।
বাংলাদেশের জন্য কী অর্থ
বাংলাদেশের নাম যোগ হওয়ায় দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল খাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নির্দিষ্ট বিশেষায়িত ওষুধ রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্ক-সংক্রান্ত একটি নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এ সুবিধা বাস্তবে কতটা কাজে লাগবে, তা নির্ভর করবে কোন কোন বাংলাদেশি পণ্য নির্ধারিত শ্রেণির মধ্যে পড়ছে, সেগুলোর পেটেন্ট ও অনুমোদনের অবস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি-সংক্রান্ত অন্যান্য শর্ত পূরণ হচ্ছে কি না তার ওপর।
বিআইএসের নোটিশে স্পষ্ট করা হয়েছে, শূন্য শুল্কের সুবিধা পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট পণ্যকে নির্ধারিত ফার্মাসিউটিক্যাল শ্রেণির মধ্যে পড়তে হবে এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে jurisdiction-সংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে হবে।
এদিকে ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে নির্দিষ্ট পেটেন্টযুক্ত ওষুধের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক কাঠামো কার্যকর হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ আমদানি নীতিতে একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন ব্যবস্থা চালু হয়েছে; একদিকে নির্দিষ্ট পেটেন্টযুক্ত ওষুধে উচ্চ শুল্ক, অন্যদিকে বিশেষায়িত ওষুধের কিছু শ্রেণি ও নির্দিষ্ট দেশের জন্য শূন্য শুল্ক।
ফলে বাংলাদেশের জন্য এ সিদ্ধান্তের গুরুত্ব মূলত বিশেষায়িত ওষুধ রপ্তানির সম্ভাব্য বাজারসুবিধার মধ্যে রয়েছে। তবে কোন বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান বা কোন নির্দিষ্ট পণ্য সরাসরি এ সুবিধা পাবে, তা পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস ও মার্কিন আমদানি নীতির শর্ত যাচাইয়ের পরই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।