সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও ময়মনসিংহে নিয়োগপত্র পাননি ৫০ জন প্রার্থী। পুলিশ ভেরিফিকেশন শেষে প্রকাশিত নিয়োগপত্রের তালিকায় নাম না থাকায় এসব প্রার্থী ও তাঁদের পরিবারের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
ভুক্তভোগী প্রার্থীদের অভিযোগ, নিয়োগের জন্য চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পাওয়ার পর তাঁরা চাকরিতে যোগদানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু পুলিশ ভেরিফিকেশন শেষে নিয়োগপত্রের তালিকায় তাঁদের নাম না থাকায় হঠাৎ করেই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। তাঁদের কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকলে তা জানিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি পুনরায় নিরপেক্ষভাবে তথ্য যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
২৫৯ জনের মধ্যে নিয়োগপত্র পেলেন ২০৯ জন
ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে ময়মনসিংহ জেলায় প্রাথমিকভাবে ২৫৯ জন প্রার্থীকে চূড়ান্ত নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল।
এর মধ্যে ১৮ জন প্রার্থী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেননি। বাকি প্রার্থীদের পুলিশ ভেরিফিকেশন ও তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে ২০৯ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়ার জন্য মনোনীত করা হয়।
এ হিসাবে প্রাথমিকভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত ২৫৯ জনের মধ্যে ৫০ জন শেষ পর্যন্ত নিয়োগপত্র পাননি। তাঁদের মধ্যে ১৮ জন নির্ধারিত সময়ে ভেরিফিকেশনের কাগজপত্র জমা না দেওয়ায় প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি। আর বাকি ২২ জনের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশনে নেতিবাচক প্রতিবেদন আসায় তাঁদের নিয়োগ আটকে গেছে বলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস জানিয়েছে।
‘চূড়ান্ত সুপারিশের পর বাদ পড়ায় হতাশ’
নিয়োগপত্র না পাওয়া কয়েকজন প্রার্থী জানান, দীর্ঘ প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাঁরা লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্তভাবে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। ফলে চাকরিতে যোগদানের প্রত্যাশায় তাঁরা মানসিক ও আর্থিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।
কিন্তু পুলিশ ভেরিফিকেশনের পর নিয়োগপত্রের তালিকায় নাম না থাকায় তাঁদের অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েছেন। তাঁদের দাবি, কোনো ভুল তথ্য, তথ্যের অসঙ্গতি কিংবা যাচাই প্রক্রিয়ার ত্রুটির কারণে কেউ বাদ পড়ে থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়োগ প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে কী কারণে নেতিবাচক প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে, তা জানার সুযোগ থাকা উচিত। একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট তথ্য পুনরায় যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।
যা বলছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, যারা নিয়োগপত্র পাননি, তাঁদের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশনের বিষয়টি রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘যারা নিয়োগপত্র পাননি, তারা সবাই পুলিশ ভেরিফিকেশনের কারণে বাদ পড়েছেন। তবে বাদ পড়া প্রার্থীদের কেউ এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে আমার অফিসে কোনো যোগাযোগ করেননি। তাদের বিষয়ে নতুন কোনো নির্দেশনাও আসেনি।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিয়ম অনুযায়ী পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রতিবেদন বিবেচনা করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
পুনর্যাচাইয়ের দাবি
এদিকে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীরা বলছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশনের নেতিবাচক প্রতিবেদনের কারণ স্পষ্ট করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো ভুল তথ্য বা অনিচ্ছাকৃত অসংগতির কারণে কারও নাম বাদ পড়ে থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তাঁদের মতে, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। তাই সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের তথ্য পুনরায় যাচাই করে তাঁদের বক্তব্য শোনার সুযোগ দেওয়া হলে প্রকৃত পরিস্থিতি পরিষ্কার হতে পারে।
মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য
নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়োগের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। ভেরিফিকেশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোনো প্রার্থীর বিষয়ে জটিলতা দেখা দিলে তা পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১ অক্টোবরের পর বাদ পড়া প্রার্থীদের সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পর্যায়ক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ফলে বর্তমানে নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আরও যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ রয়েছে।
অনিশ্চয়তায় প্রার্থীরা
চাকরির জন্য দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও পরীক্ষার ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পর নিয়োগপত্র না পাওয়ায় ময়মনসিংহের এসব প্রার্থীর মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যারা চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পর অন্য চাকরি বা ব্যক্তিগত পরিকল্পনা পরিবর্তন করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন নতুন করে সংকটে পড়েছেন।
প্রার্থীরা বলছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা তথ্যগত অসংগতি থাকলে তা জানানো এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া উচিত। পাশাপাশি দ্রুত ও স্বচ্ছ পুনর্যাচাইয়ের মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান চান তাঁরা।
এখন ১ অক্টোবরের পর সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের ভেরিফিকেশন-সংক্রান্ত বিষয়গুলো কীভাবে পর্যালোচনা করা হয় এবং তাঁদের নিয়োগের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত আসে, সেদিকেই নজর রয়েছে ভুক্তভোগী প্রার্থী ও তাঁদের পরিবারের।