গত ১২ অক্টোবর এ নিয়োগের প্রস্তাবে অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি বা অনুমোদিত সংখ্যার অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগের ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে দুই সিটি করপোরেশনকে সতর্ক করেছে মন্ত্রণালয়। অনিয়ম হলে সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে দায় নিতে হবে বলেও নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, জরুরি প্রয়োজন এবং প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতেই কেবল দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কর্মী নিয়োগ করা যাবে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোনোভাবেই জনবল নিয়োগ দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে অনুমোদিত সংখ্যার অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই মাসিক ভিত্তিতে এসব কর্মী নিয়োগ দেওয়া যাবে না। তাঁদের অবশ্যই দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করাতে হবে। কর্মীদের মজুরি সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের নিজস্ব বাজেট থেকে পরিশোধ করতে হবে। এ জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কাছে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ চাওয়া যাবে না। মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের জারি করা নীতিমালাও অনুসরণ করতে হবে।
অর্থ বিভাগের ‘দৈনিক ভিত্তিতে সাময়িক শ্রমিক নিয়োজিতকরণ’ নীতিমালা অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৮০০ টাকা। এ হিসাবে ৩০ দিনের জন্য একজন শ্রমিকের মজুরি দাঁড়ায় ২৪ হাজার টাকা।
নীতিমালায় অন্যান্য বিভাগীয় শহর ও সিটি করপোরেশন এলাকার শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৭৫০ টাকা এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ৭০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন নিয়োগের ফলে রাজধানীর বর্জ্য অপসারণ, সড়ক ও জনপরিসর পরিচ্ছন্ন রাখা এবং মশকনিধন কার্যক্রমে অতিরিক্ত কর্মী যুক্ত হবে। এতে দুই সিটি করপোরেশনের দৈনন্দিন সেবা কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বিপুলসংখ্যক কর্মী কোন প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে দুই সিটি করপোরেশন এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
এত দিন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বিভিন্ন পদে আউটসোর্সিং বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মী নেওয়ার প্রচলন ছিল। তবে গত ২১ সেপ্টেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয় ‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা, ২০২৫’ সংশোধন করে। সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরগুলো সরাসরি কর্মী নিয়োগ দিতে পারবে। এ ছাড়া অর্থ বিভাগের অনুমোদিত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানির (আইআইএফসি) মাধ্যমেও নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
গত সোমবার তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঢাকা মহানগরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণবিষয়ক এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার জানান, সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা সংস্থাগুলো চাইলে নিজেরাও সরাসরি কর্মী নিয়োগ দিতে পারবে।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে অতীতে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পছন্দের লোক নিয়োগের চেষ্টা এবং চাকরি স্থায়ী করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে নতুন নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনুমোদিত জনবল কাঠামো ও নির্ধারিত নিয়ম মেনে নিয়োগ সম্পন্ন করা না হলে নতুন করে অনিয়মের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খয়বর রহমান বলেন, কী প্রক্রিয়ায় কর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে যে নির্দেশনা দেওয়া হবে, সে অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, তাঁদের পর্যাপ্ত জনবলের প্রয়োজন রয়েছে। এ জন্য অনেক আগেই অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। তবে অনুমোদিত নথি এখনো তাঁদের হাতে পৌঁছায়নি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, রাজধানীতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হয়। এসব বর্জ্য দ্রুত অপসারণের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা ও মশকনিধন কার্যক্রম জোরদার করতে অতিরিক্ত জনবল প্রয়োজন।
তবে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর পরামর্শ, দুই সিটি করপোরেশনের উচিত একটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করা, যাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব ছাড়াই পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়।
সব মিলিয়ে, রাজধানীর পরিচ্ছন্নতা ও নাগরিক সেবা উন্নত করতে নতুন কর্মী নিয়োগের উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে শুধু জনবল বাড়ালেই প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে না। নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, কর্মীদের যথাযথভাবে কাজে লাগানো এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে সেবার মান উন্নত করাই হবে দুই সিটি করপোরেশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
/প্রথম আলো