অনুমোদিত সীমার বাইরে শুল্কমুক্ত পণ্য, বিশেষ করে অ্যালকোহল মজুতের অভিযোগে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নুর ইসলামের মালিকানাধীন ‘টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেড’ এর চারটি ওয়্যারহাউস সিলগালা করেছে যৌথ তদন্ত দল।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) রাতে রাজধানীর দক্ষিণ গুলশানে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-১ (এসআরবি-১) যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে গুদামগুলো সিলগালা করে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে শুক্রবার ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির ডিপ্লোমেটিক ওয়্যারহাউস কার্যক্রমে একাধিক অসংগতি পাওয়া যায়।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির নথিতে অনুমোদিত ওয়্যারহাউসের সংখ্যা ছিল দুটি। তবে সরেজমিন পরিদর্শনে চারটি ওয়্যারহাউসে পণ্য মজুতের তথ্য পাওয়া যায়। অনুমোদনের বাইরে থাকা গুদাম ব্যবহারের বিষয়টি তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে।
বন্ড সুবিধায় আমদানি করা শুল্কমুক্ত পণ্য অনুমোদিত ব্যবস্থার বাইরে সরিয়ে নেওয়া কিংবা খোলাবাজারে বিক্রির আশঙ্কা থাকায় তদন্তের স্বার্থে প্রতিষ্ঠানটির চারটি ওয়্যারহাউসই সিলগালা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এনবিআর। এর মধ্যে অনুমোদিত দুটি ওয়্যারহাউসও রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেড বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকদের জন্য শুল্কমুক্ত অ্যালকোহলসহ নির্দিষ্ট পণ্য সরবরাহের লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শুল্কমুক্ত মদ অনুমোদিত ব্যবস্থার বাইরে নিয়ে খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে খতিয়ে দেখছিল রাজস্ব বিভাগের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। যৌথ অভিযানের পর প্রতিষ্ঠানটির ওয়্যারহাউস ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে।
এদিকে নুর ইসলাম ও তার পরিবারের বিদেশে আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের তথ্য নিয়েও অনুসন্ধান চালাচ্ছে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) এবং আয়কর গোয়েন্দা ইউনিট কানাডায় নুর ইসলাম ও তার পরিবারের আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছে। এসব তথ্যের মধ্যে কানাডার নাগরিকত্ব এবং সেখানে কয়েকটি কোম্পানির মালিকানা বা সংশ্লিষ্টতার তথ্য রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০১২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এক বছরে প্রায় ৯৫ কোটি টাকা রেমিট্যান্স দেশে আনার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অর্থের উৎস, কর-সংক্রান্ত ঘোষণা এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানির তথ্য যাচাই করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
তবে বিদেশি নাগরিকত্ব, কোম্পানির মালিকানা কিংবা আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে কোনো আইন লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত নয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টস বন্ডের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধান এবং বৃহস্পতিবারের অভিযানকে সরাসরি সালমান মুক্তাদিরের সাম্প্রতিক বিতর্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার সুযোগ নেই। তাদের ভাষ্য, নুর ইসলামের ব্যবসা, কর-সংক্রান্ত বিষয় এবং শুল্কমুক্ত পণ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আগে থেকেই অনুসন্ধান চালিয়ে আসছিল।
তবে ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে দক্ষিণ মানিকদীর নিউ গিনি আবাসন প্রকল্প এলাকায় হামলার পর সালমান মুক্তাদিরের বক্তব্য এবং এ ঘটনায় তার পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে আলোচনার পর তদন্ত কার্যক্রমে গতি এসেছে কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
দক্ষিণ মানিকদীর নিউ গিনি প্রোপার্টিজ এলাকায় হামলার ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া জমি দখল ও পূর্বশত্রুতার অভিযোগে মামলা করেন। ওই মামলায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
এর মধ্যেই গত বুধবার বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সালমান মুক্তাদিরের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা গেছে।
এর পরদিনই তার শ্বশুর শেখ নুর ইসলামের মালিকানাধীন টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেডের চারটি ওয়্যারহাউসে অভিযান চালিয়ে সেগুলো সিলগালা করা হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ওয়্যারহাউসের অনুমোদন, বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পণ্যের হিসাব, শুল্কমুক্ত অ্যালকোহলের মজুত ও সরবরাহ এবং প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ও করসংক্রান্ত নথি যাচাইয়ের পরই অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে।