‘মেকানিক্স’ থেকে ‘ফিডব্যাক’— নানা ঘরানার ব্যান্ডের গানে মাতলেন হাজারো মানুষ।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে এ গানের অনুষ্ঠান আয়োজন করে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়
রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ যেন পরিণত হয়েছিল এক বিশাল সংগীতমঞ্চে। হাজারো মানুষের কণ্ঠে প্রিয় গানের সুর, করতালি আর উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। ‘মেকানিক্স’ থেকে ‘শিরোনামহীন’, ‘আর্টসেল’ থেকে ‘ফিডব্যাক’—দেশের জনপ্রিয় সাতটি ব্যান্ডের পরিবেশনায় সংগীতপ্রেমীদের জন্য দিনটি হয়ে ওঠে বিশেষ এক উৎসব।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে শনিবার (৭ নভেম্বর) রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে আয়োজন করা হয় ‘কনসার্ট ফর সলিডারিটি’। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করে বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশন (বামবা)। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ছিল আয়োজনের ব্যবস্থাপনায়।
কনসার্টে অংশ নেয় দেশের সাতটি জনপ্রিয় ব্যান্ড—মেকানিক্স, শিরোনামহীন, আর্টসেল, ফিডব্যাক, ওয়ারফেজ, মাইলস ও নগরবাউল জেমস। সাতটি ব্যান্ডের সাত ঘণ্টার এই সংগীত আয়োজন ঘিরে দুপুর থেকেই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জড়ো হতে থাকেন বিভিন্ন বয়সী দর্শক-শ্রোতা।
বিকেল গড়ানোর আগেই অনুষ্ঠানস্থল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। শুধু মাঠেই নয়, আশপাশের উঁচু জায়গা ও গাছের ডালেও দেখা যায় দর্শকদের। কেউ এসেছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে, কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। প্রিয় ব্যান্ডের গান সরাসরি শোনার অপেক্ষায় দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতেও আপত্তি ছিল না তাদের।
ধানমন্ডি থেকে দুপুর ১টার দিকে কনসার্টস্থলে আসেন সানজিদা সুলতানা। সামনের সারিতে জায়গা পেতে আগেভাগেই ব্যারিকেডের কাছে অবস্থান নেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, অনেক দিন পর এমন বড় আয়োজনের কনসার্ট উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছেন। তিন বন্ধু মিলে এসেছেন, ভিড়ের চাপ থাকলেও শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠান উপভোগ করার প্রত্যাশা ছিল তাঁদের।
একই রকম উচ্ছ্বাস দেখা যায় মিরপুর থেকে আসা চাকরিজীবী তানভীর হোসেনের মধ্যেও। ছুটির দিন হওয়ায় বন্ধুদের সঙ্গে গান শুনতে এসেছিলেন তিনি। খোলা মাঠে এত বড় আয়োজনকে প্রশংসনীয় উল্লেখ করে তানভীর বলেন, ভিড় ও চাপের বিষয়টি মাথায় রেখেই তাঁরা কনসার্টে এসেছেন।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমিন বেগম জানান, মানুষের মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়া এবং জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের চেতনা ধারণ করাই এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। শুধু রাজধানীতে নয়, দেশের প্রতিটি জেলার শিল্পকলা একাডেমিতেও নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, যাতে সর্বস্তরের মানুষ উৎসবে অংশ নিতে পারেন।
মেকানিক্সের গানে শুরু সংগীতের উন্মাদনা
কনসার্টের শুরুতেই মঞ্চে ওঠে হেভি মেটাল ব্যান্ড মেকানিক্স। প্রায় ৪০ মিনিটের পরিবেশনায় পাঁচটি গান শোনায় ব্যান্ডটি। দেশকে উৎসর্গ করে ‘অপরাজীয়’ গান দিয়ে শুরু হয় তাদের পরিবেশনা। এরপর প্রয়াত ও সাবেক সদস্যদের স্মরণে পরিবেশন করে ‘নিয়তি’। পাশাপাশি ‘ছিন্ন পৃষ্ঠা’, ‘শুভ্র শহর’ এবং প্রথম অ্যালবামের জনপ্রিয় গান ‘বিস্ময়’ পরিবেশন করে দর্শকদের মাতিয়ে রাখে তারা।
পরিবেশনা শেষে মেকানিক্সের দলনেতা ও ভোকালিস্ট আফতাবুজ্জামান ত্রিদিব বলেন, গানের মাধ্যমে মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে চায় মেকানিক্স। সমাজের নানা অসংগতি, অন্যায় ও মানুষের প্রতিবাদের কথাই তাদের গানে তুলে ধরার চেষ্টা থাকে। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, অতীতের সংগ্রামের দিনগুলো স্মরণ করে ইতিবাচক কিছু অর্জনে অনুপ্রাণিত হওয়া প্রয়োজন।
শিরোনামহীনের গানে কণ্ঠ মেলাল হাজারো মানুষ
মেকানিক্সের পর মঞ্চে আসে শিরোনামহীন। শুরুতেই ‘পাখি’ গান পরিবেশন করে তারা। এরপর কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী সৃষ্টি ‘দুর্গম গিরি কান্তার-মরু’ গেয়ে ভিন্ন আবহ তৈরি করে ব্যান্ডটি।
এরপর একে একে শোনায় শ্রোতাপ্রিয় ‘মা’, ‘ইচ্ছে ঘুড়ি’, ‘এই অবেলায়’ ও ‘আবার হাসি’। বিশেষ করে ‘এই অবেলায়’ গানটির সময় পুরো অনুষ্ঠানস্থলে তৈরি হয় অন্য রকম আবেগঘন পরিবেশ। ব্যান্ডের সঙ্গে কণ্ঠ মেলান হাজারো দর্শক। প্রিয় গানের সুরে একসঙ্গে গলা মেলানোর সেই মুহূর্ত কনসার্টের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়।
শিরোনামহীনের দলনেতা, বেজ গিটারিস্ট ও গীতিকার জিয়াউর রহমান জিয়া বলেন, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এ কনসার্টে বামবার সহযোগিতা থাকায় আয়োজনের পরিবেশ ছিল আলাদা। নিজেদের সংগীতাঙ্গনের এমন একটি আয়োজনে অংশ নিতে পেরে তাঁরা আনন্দিত। অনুষ্ঠানটির সফলতাও কামনা করেন তিনি।
শৃঙ্খলা ও আয়োজন নিয়ে সন্তুষ্ট বামবা
বড় পরিসরে উন্মুক্ত স্থানে কনসার্ট আয়োজনের ক্ষেত্রে দর্শক সামলানো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানসম্মত পরিবেশ বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। তবে পুরো আয়োজনের ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা ছিল বলে জানান বামবার সহসভাপতি ও ওয়ারফেজ ব্যান্ডের শেখ মনিরুল আলম টিপু।
তাঁর মতে, ব্যান্ড নির্বাচন থেকে শুরু করে সাউন্ড, লাইট, মঞ্চের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট মান বজায় রাখার চেষ্টা করে বামবা। দর্শকেরা যেন উৎসবের আমেজে স্বাচ্ছন্দ্যে গান উপভোগ করতে পারেন, সেটিই ছিল আয়োজকদের লক্ষ্য।
শিরোনামহীনের পর পর্যায়ক্রমে মঞ্চে আসে আর্টসেল ও ফিডব্যাক। এরপর দর্শকদের সামনে গান পরিবেশন করে ওয়ারফেজ, মাইলস এবং নগরবাউল জেমস। সব মিলিয়ে সাতটি ব্যান্ডের পরিবেশনায় জমে ওঠে দীর্ঘ সংগীত সন্ধ্যা।
ওয়ারফেজের পরিবেশনা প্রসঙ্গে টিপু জানান, ৭ নভেম্বরের আয়োজনের সঙ্গে মিল রেখে সাতটি গান পরিবেশনের পরিকল্পনা ছিল ব্যান্ডটির। দর্শকদের পছন্দের জনপ্রিয় গানগুলো দিয়েই সাজানোর কথা ছিল তাদের পরিবেশনা।
এক মঞ্চে সাত ব্যান্ড, সংগীতেই ঐক্যের বার্তা
‘কনসার্ট ফর সলিডারিটি’ শুধু জনপ্রিয় ব্যান্ডগুলোর পরিবেশনায় সীমাবদ্ধ ছিল না; এর মধ্য দিয়ে সংগীতপ্রেমীদের এক জায়গায় মিলিত হওয়ার সুযোগও তৈরি হয়। বিভিন্ন প্রজন্মের শ্রোতা একই মঞ্চে নিজেদের পছন্দের ব্যান্ডের গান উপভোগ করেন।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সংগীতের মধ্য দিয়ে ঐক্য, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বার্তা তুলে ধরার চেষ্টা ছিল আয়োজকদের। দীর্ঘদিন পর রাজধানীর উন্মুক্ত স্থানে এত বড় ব্যান্ড সংগীতের আয়োজন ঘিরে দর্শকদের উচ্ছ্বাসও ছিল চোখে পড়ার মতো।
প্রিয় গানের সঙ্গে হাজারো মানুষের একসঙ্গে কণ্ঠ মেলানো, ব্যান্ডগুলোর মঞ্চ মাতানো পরিবেশনা এবং উৎসবমুখর উপস্থিতি—সব মিলিয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের শনিবারের সন্ধ্যা হয়ে থাকল সংগীতপ্রেমীদের স্মরণীয় এক অভিজ্ঞতা।