অক্সফোর্ড ইকোনমিকস বিশ্বের ১৬৩ দেশের ১ হাজার শহরকে অর্থনীতি, মানবসম্পদ, জীবনযাত্রার মান, পরিবেশ ও শাসন। এই পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করেছে। মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে অর্থনীতিতে ৩০, মানবসম্পদ ও জীবনযাত্রার মানে ২৫ করে এবং পরিবেশ ও শাসনে ১০ করে নম্বর রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশের শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার পর সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম। বৈশ্বিক তালিকায় চট্টগ্রামের অবস্থান ৭৬৩তম। এরপর রাজশাহী ৭৭৯তম, খুলনা ৮১১তম, সিলেট ৮৩৪তম, কুমিল্লা ৮৮৩তম, ময়মনসিংহ ৮৯৫তম এবং বগুড়া ৯২৬তম অবস্থানে রয়েছে।
এক বছরে সবচেয়ে বেশি পিছিয়েছে রাজশাহী
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের সূচকে এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পিছিয়েছে রাজশাহী। শহরটির অবস্থান ৬৬ ধাপ নেমেছে। চট্টগ্রাম পিছিয়েছে ১৪ ধাপ এবং বগুড়া ৩২ ধাপ।
অন্যদিকে কুমিল্লা আগের অবস্থান ধরে রেখেছে। ফলে সামগ্রিক সূচকে বাংলাদেশের শহরগুলোর অবস্থান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিতে এগিয়ে ঢাকা
পাঁচটি সূচকের মধ্যে অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশের শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। এ সূচকে বিশ্বে রাজধানী শহরটির অবস্থান ২৮৬তম।
একটি শহরের জিডিপির আকার ও প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু জিডিপি, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনীতির বৈচিত্র্য; এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে অর্থনৈতিক সূচক তৈরি করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের বড় অংশ ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় এ সূচকে রাজধানী অন্য শহরগুলোর তুলনায় এগিয়ে রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মানবসম্পদ সূচকেও তুলনামূলক ভালো ঢাকা
মানবসম্পদ সূচকেও বাংলাদেশের অন্য শহরগুলোর তুলনায় তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। এ সূচকে রাজধানীর বৈশ্বিক অবস্থান ১৭৮তম।
শিক্ষা, ব্যবসার পরিবেশ এবং জনমিতিক প্রবণতার মতো বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মানবসম্পদ সূচক নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সূচকে ঢাকার পর রয়েছে খুলনা, ৫৪১তম এবং রাজশাহী, ৫৯৯তম।
তবে অর্থনীতি ও মানবসম্পদে তুলনামূলক ভালো অবস্থান থাকলেও পরিবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শহরগুলোর চিত্র বেশ হতাশাজনক।
পরিবেশ সূচকে তলানিতে বাংলাদেশের শহরগুলো
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের সূচকে পরিবেশের দিক থেকে বাংলাদেশের কোনো শহরই উল্লেখযোগ্য অবস্থানে নেই। দেশের শহরগুলোর মধ্যে পরিবেশ সূচকে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা সিলেটের বৈশ্বিক অবস্থান ৭৩৫তম।
এরপর রাজশাহী ৮৫২তম, চট্টগ্রাম ৯২৪তম, ঢাকা ৯৩০তম, ময়মনসিংহ ৯৪০তম এবং খুলনা ৯৭৪তম অবস্থানে রয়েছে।
অর্থাৎ অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদ সূচকে ঢাকা তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও পরিবেশের ক্ষেত্রে রাজধানী দেশের শীর্ষ শহরগুলোর মধ্যেও পিছিয়ে রয়েছে। বায়ুদূষণ, ঘনবসতি, জলাবদ্ধতা, অপর্যাপ্ত সবুজ এলাকা এবং নগর ব্যবস্থাপনার নানা সীমাবদ্ধতা এ অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জীবনযাত্রার মানে এগিয়ে রাজশাহী
জীবনযাত্রার মানের সূচকে বাংলাদেশের শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী। বৈশ্বিকভাবে শহরটির অবস্থান ৫৪২তম।
এ সূচকে মানুষের জীবনমান, স্বাস্থ্য, আর্থিক অবস্থা এবং নাগরিক সুবিধার সুযোগ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। রাজশাহীর পর এ সূচকে বাংলাদেশের মধ্যে রয়েছে খুলনা ৬১২তম এবং চট্টগ্রাম ৬৫৩তম।
তুলনামূলক কম জনঘনত্ব, নগর পরিবেশ এবং নাগরিক জীবনের কিছু সুবিধার কারণে রাজশাহী এ সূচকে দেশের অন্য শহরগুলোর তুলনায় এগিয়ে রয়েছে।
শাসন ও নগর ব্যবস্থাপনাই বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা বড় অবকাঠামো গড়ে তুললেই একটি শহর বাসযোগ্য হয়ে ওঠে না। একটি শহরের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য পরিবেশ সুরক্ষা, পরিকল্পিত নগরায়ণ, কার্যকর শাসন, মানসম্মত নাগরিক সেবা এবং মানুষের জীবনমান নিশ্চিত করা জরুরি।
ঢাকার ক্ষেত্রে জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ঘনবসতি, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা এবং নাগরিক সেবার ঘাটতি নগরজীবনে বাড়তি চাপ তৈরি করছে। দেশের অন্যান্য বড় শহরেও অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ, পরিবেশের অবনতি এবং নাগরিক সুবিধার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় রাজধানীর ওপর ক্রমেই বাড়ছে জনসংখ্যার চাপ। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের অন্যান্য শহরে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকেন্দ্রীকরণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাসযোগ্যতার সূচকেও পিছিয়ে ঢাকা
শুধু অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের সূচকেই নয়, অন্য একটি আন্তর্জাতিক সূচকেও ঢাকার অবস্থান উদ্বেগজনক। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ২০২৬ সালের গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্সে ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। অর্থাৎ বিশ্বের তৃতীয় কম বাসযোগ্য শহর হিসেবে তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী।
এই সূচকে নগরীর অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ, স্থিতিশীলতাসহ বিভিন্ন বিষয় মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলে দুটি আন্তর্জাতিক সূচকের ফলাফলেই বাংলাদেশের শহরগুলোর পরিবেশ, নাগরিক সেবা ও বাসযোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের চিত্র উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের শহরগুলোর বৈশ্বিক অবস্থান উন্নত করতে হলে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে নজর দিলেই হবে না। পরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ সুরক্ষা, মানসম্মত নাগরিক সেবা, কার্যকর নগর শাসন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকেন্দ্রীকরণে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এসব ক্ষেত্রে কাঠামোগত উন্নতি না হলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক শহর সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।