মেজর লিগ সকারে (এমএলএস) আবারও নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিলেন লিওনেল মেসি। বয়স কিংবা সময়—কোনোটিই যে তাঁর ফুটবলীয় সামর্থ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না, সেটিই যেন আরও একবার দেখালেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা দুই মৌসুম এমএলএসের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার ‘গোল্ডেন বুট’ জিতে ইতিহাস গড়েছেন ইন্টার মায়ামির অধিনায়ক। ২০২৬ মৌসুমে ২৬ গোল করে এই স্বীকৃতি পেয়েছেন আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী তারকা।
তবে ব্যক্তিগত অর্জনের আনন্দের দিনটি পুরোপুরি রাঙাতে পারেনি তাঁর দল ইন্টার মায়ামি। নিয়মিত মৌসুমের শেষ ম্যাচে নিজেদের মাঠে শার্লট এফসির বিপক্ষে ৩-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ৩-৩ গোলের ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে মায়ামিকে। ম্যাচে গোল করতে না পারলেও সতীর্থদের দিয়ে দুটি গোল করিয়ে দলের আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন মেসি।
এমএলএসের নিয়মিত মৌসুমের শেষ ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় ৭ নভেম্বর। মায়ামির ন্যু স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় রোববার ভোরে শুরু হওয়া ম্যাচে প্রথমার্ধেই তিন গোলের লিড নেয় স্বাগতিকেরা। কিন্তু বিরতির পর দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় শার্লট। শেষ পর্যন্ত দুই দলের পয়েন্ট ভাগাভাগি হয়।
এদিকে ম্যাচের ফল যা-ই হোক, গোল্ডেন বুটের দৌড়ে মেসির শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে কোনো সংশয় ছিল না। ৩১ ম্যাচে ২৬ গোল করে মৌসুম শেষ করেছেন তিনি। দ্বিতীয় স্থানে থাকা এফসি ডালাসের পেতার মুসার গোল ২২টি। আর ২১ গোল করে তৃতীয় হয়েছেন ন্যাশভিলের স্যাম সারিজ। ভ্যাঙ্কুভার হোয়াইটক্যাপসের ব্রায়ান হোয়াইট করেছেন ২০ গোল।
এর মধ্য দিয়ে এমএলএসের ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত করলেন মেসি। এর আগে একাধিক খেলোয়াড় একাধিকবার গোল্ডেন বুট জিতলেও কেউ টানা দুই মৌসুম এই পুরস্কার জিততে পারেননি। মেসিই প্রথম খেলোয়াড়, যিনি পরপর দুই বছর লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হলেন। সব মিলিয়ে তিনি ষষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে একাধিকবার এই পুরস্কার জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করেছেন।
এবারের মৌসুমে মেসির পারফরম্যান্সের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের গোলের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার দক্ষতা। ২৬ গোলের সঙ্গে তাঁর নামের পাশে রয়েছে ১৭টি অ্যাসিস্ট। অর্থাৎ গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে সরাসরি ৪৩টি গোলে অবদান রেখেছেন তিনি। পুরো লিগে গোল-অবদানের হিসাবে এটিই সর্বোচ্চ।
মাত্র ২ হাজার ৬৬৪ মিনিট মাঠে থেকেই এমন পরিসংখ্যান গড়েছেন মেসি। প্রতি ম্যাচে গোল করার ধারাবাহিকতা এবং আক্রমণে তাঁর কার্যকারিতা তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে রেখেছে। বিশেষ করে বয়সের এই পর্যায়েও পুরো মৌসুমজুড়ে এমন ধারাবাহিকতা ধরে রাখা তাঁর অসাধারণ ফিটনেস ও ফুটবলীয় দক্ষতারই প্রমাণ।
মৌসুমে মেসির ব্যক্তিগত সেরা মুহূর্তগুলোর একটি ছিল কানাডার ক্লাব সিএফ মন্ট্রিয়লের বিপক্ষে। গত ২৯ আগস্টের সেই ম্যাচে প্রতিপক্ষকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দেয় ইন্টার মায়ামি। অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সে একাই চারটি গোল করেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। এ ছাড়া বিভিন্ন ম্যাচে জোড়া গোল এবং দুর্দান্ত ফ্রি-কিকেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন তিনি।
এবারের মৌসুমে মেসির ২৬ গোলের মধ্যে মাত্র একটি এসেছে পেনাল্টি থেকে। বাকি ২৫টি গোল করেছেন ওপেন প্লে থেকে। অর্থাৎ প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে এবং নিজের দক্ষতায় গোল করার ক্ষেত্রেই বেশি সফল ছিলেন তিনি। এমএলএসের এক মৌসুমে পেনাল্টি ছাড়া গোলের হিসাবে এটি লিগ ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এই তালিকার শীর্ষেও রয়েছেন মেসি, ২০২৫ সালে করেছিলেন ২৮টি।
ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি ইন্টার মায়ামির সামনে এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য এমএলএস কাপের শিরোপা ধরে রাখা। ২০২৫ সালে ক্লাবটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমএলএস কাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছিল মায়ামি। এবারও সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করতে চান মেসি ও তাঁর সতীর্থরা।
নিয়মিত মৌসুম শেষে ইস্টার্ন কনফারেন্সে ৬০ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইন্টার মায়ামি। তাদের ওপরে রয়েছে ন্যাশভিল। ফলে প্লে-অফের প্রথম রাউন্ডে সপ্তম বাছাই কলম্বাস ক্রুর মুখোমুখি হবে মায়ামি। প্রথম রাউন্ডের লড়াই হবে তিন ম্যাচের সিরিজে। দ্বিতীয় বাছাই হওয়ায় নিজেদের মাঠে খেলার সুবিধাও পাবে মেসির দল।
এদিকে টানা দুই মৌসুম গোল্ডেন বুট জয়ের পর মেসির সামনে অপেক্ষা করছে আরও একটি ঐতিহাসিক অর্জনের হাতছানি। এবারও তিনি এমএলএসের বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ল্যান্ডন ডোনোভান এমভিপি অ্যাওয়ার্ড জয়ের দৌড়ে রয়েছেন।
২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো এমএলএসের এমভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন মেসি। পরের বছর ২০২৫ সালেও এই পুরস্কার জিতে ইতিহাস গড়েন তিনি। এবার জিততে পারলে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে তিনবার এমএলএসের এমভিপি হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করবেন আর্জেন্টাইন তারকা।
এর আগে ১৯৯৭ ও ২০০৩ সালে দুবার এমএলএসের এমভিপি হয়েছিলেন প্রেকি। মেসি সেই রেকর্ড ইতিমধ্যে ছুঁয়েছেন। এখন তাঁর সামনে সেটিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের নিয়মিত মৌসুমটি মেসির জন্য ব্যক্তিগত অর্জনের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকল। গোল্ডেন বুট, ৪৩টি গোল-অবদান এবং একের পর এক রেকর্ড—সবকিছু মিলিয়ে আবারও প্রমাণ করেছেন, ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজের প্রভাব ধরে রাখতে এখনো কতটা সক্ষম তিনি। তবে ব্যক্তিগত সাফল্যের এই গল্পকে পূর্ণতা দিতে এবার তাঁর লক্ষ্য ইন্টার মায়ামিকে আরও একটি এমএলএস কাপ উপহার দেওয়া।