বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের গতিময় পেসার নাহিদ রানার চোটের সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার ল্যাব্রাম ছিঁড়ে যাওয়ার চোট শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়াতেই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন এই ডানহাতি পেসার। চোটের ধরন ও পুনর্বাসনের সময় বিবেচনায় নিয়ে মাঠে ফেরার জন্য তাকে আরও অপেক্ষা করতে হতে পারে। ফলে আসন্ন আন্তর্জাতিক সিরিজগুলোতে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণে তাকে পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
গত মাসের শেষ দিকে আবারও চোটে পড়েন নাহিদ। এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে চোটের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তাকে। নতুন করে সমস্যায় পড়ার পর দ্বিতীয় দফায় অস্ট্রেলিয়ায় যান এই পেসার। সেখানে চিকিৎসক পিটার দি আলেসান্দ্রোর পরামর্শ নেন তিনি। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তার চোটের প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা গেছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) এক কর্মকর্তা ক্রিকেটভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ক্রিকবাজকে জানিয়েছেন, নাহিদকে ইতোমধ্যে ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শুরু হয়েছে তার পুনর্বাসন কার্যক্রম।
ওই কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর থেকে নাহিদের বোলিং শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বোলিংয়ে ফেরার অর্থ এই নয় যে তিনি সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে অংশ নেওয়ার মতো পুরোপুরি ফিট হয়ে যাবেন। পুনর্বাসনের প্রতিটি ধাপে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। ব্যথা, অস্বস্তি কিংবা নতুন কোনো সমস্যা দেখা দিলে বোলিংয়ের সূচি পরিবর্তন করতে হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট একটি তারিখের মধ্যে তাকে মাঠে ফেরানোর বিষয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
নাহিদ রানার জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চোট কাটিয়ে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠা। একজন দ্রুতগতির পেসারের ক্ষেত্রে বোলিংয়ের সময় শরীরের বিভিন্ন অংশে প্রচুর চাপ পড়ে। বিশেষ করে রানআপ, শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং বল ছাড়ার মুহূর্তে পেশি ও অন্যান্য শারীরিক কাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। সে কারণে পুনর্বাসন শেষ না করে তাড়াহুড়ো করে মাঠে ফিরলে চোটের সমস্যা আবারও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিসিবির ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নাহিদের পুনর্বাসনের অগ্রগতি এবং শারীরিক সুস্থতার ওপরই নির্ভর করবে তার প্রত্যাবর্তনের সময়। বোলিং শুরু করার পর তিনি কতটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন, কতটা চাপ নিতে পারছেন এবং ধীরে ধীরে পূর্ণ গতিতে বল করার সক্ষমতা ফিরে পাচ্ছেন কি না, সেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বাংলাদেশের দুই টেস্টের সিরিজের আগে পুরোপুরি ফিট হতে না পারলে সাদা বলের সিরিজ দিয়ে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফিরতে পারেন নাহিদ। তবে এটি এখনো সম্ভাবনার পর্যায়ে রয়েছে। তার পুনর্বাসনের অগ্রগতি সম্পর্কে পরবর্তী মূল্যায়নের পরই প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশের পেস বোলিং বিভাগে নাহিদ রানা গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। তার গতি ও আক্রমণাত্মক বোলিং প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের চাপে রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে নতুন বলে উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি দ্রুতগতির শর্ট বল দিয়ে ব্যাটারদের পরীক্ষা করার সামর্থ্য রয়েছে তার। এমন একজন পেসার দীর্ঘ সময় দলের বাইরে থাকলে বোলিং আক্রমণের পরিকল্পনায় বিকল্প খুঁজতে হয় টিম ম্যানেজমেন্টকে।
নাহিদ রানার চোটের সমস্যা অবশ্য নতুন নয়। গত জুলাইয়ে জিম্বাবুয়ে সফরে গ্রেড-২ সাইড স্ট্রেইনে আক্রান্ত হন তিনি। ওই চোটের কারণে পরবর্তী সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা ও সিরিজে অংশ নিতে পারেননি এই পেসার। তার অনুপস্থিতির তালিকায় রয়েছে অস্ট্রেলিয়া সফর, এশিয়ান গেমস এবং আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্ট।
প্রথম চোট থেকে সেরে ওঠার জন্য পুনর্বাসন চলাকালে নতুন করে নিতম্বের পেশিতে চোট পান নাহিদ। এতে তার মাঠে ফেরার প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ হয়ে যায়। একটির পর একটি শারীরিক সমস্যা দেখা দেওয়ায় স্বাভাবিক অনুশীলন ও বোলিংয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে তার জন্য। ফলে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার আগেই ক্রিকেটে ফেরার পরিকল্পনা বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়েকে নিয়ে আয়োজিত ত্রিদেশীয় সিরিজ থেকেও ছিটকে যান তিনি। বাংলাদেশের জন্য ওই সিরিজটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তুতির সুযোগ। সেখানে নাহিদের অনুপস্থিতি দলের পেস আক্রমণে একটি ঘাটতি তৈরি করে। তার বদলে অন্য বোলারদের ওপর বাড়তি দায়িত্ব পড়ে।
একজন তরুন ক্রিকেটারের ক্যারিয়ারে নিয়মিত ম্যাচ খেলা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বারবার চোটে পড়লে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়। তাই নাহিদের ক্ষেত্রে শুধু দ্রুত মাঠে ফেরাই নয়, দীর্ঘ মেয়াদে চোটমুক্ত থেকে খেলার উপযোগী শারীরিক সক্ষমতা অর্জন করাও বড় লক্ষ্য।
এদিকে আগামী ২৮ অক্টোবর থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ শুরু করবে বাংলাদেশ। জাতীয় দলের জন্য সিরিজটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও নাহিদের বর্তমান পুনর্বাসন পরিস্থিতির কারণে তাকে কবে নাগাদ আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেখা যাবে, তা নিয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে সমর্থকদের।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজের আগে নাহিদ পুরোপুরি ফিট হতে পারবেন কি না, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠতে না পারলে সাদা বলের ক্রিকেটে ফেরার পরিকল্পনা সামনে আসতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসক, পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞ ও দলের মেডিকেল বিভাগের মূল্যায়নই গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা নাহিদ রানার দ্রুত প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় থাকলেও তার ক্ষেত্রে ধৈর্য ধরাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পুরোপুরি সুস্থ না হয়ে মাঠে ফিরলে আবারও চোটে পড়ার ঝুঁকি থেকে যায়। আপাতত অস্ট্রেলিয়ায় পুনর্বাসন শেষ করে ধাপে ধাপে বোলিংয়ে ফেরাই তার প্রধান লক্ষ্য। এরপর শারীরিক সক্ষমতা ও বোলিংয়ের অগ্রগতি সন্তোষজনক হলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার পথ খুলতে পারে এই গতিময় পেসারের জন্য।