ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর বিনোদনবিষয়ক সাময়িকী স্ক্রিন-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সিনেমাটির সাফল্যের নেপথ্যের গল্প তুলে ধরেছেন চিত্রগ্রাহক রাজকান্ত এস কে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ছবিটি ফিরিয়ে দেওয়া এক প্রভাবশালী প্রযোজককে তিনি আগেই সতর্ক করেছিলেন। ভবিষ্যতে এ সিদ্ধান্তের জন্য তাঁকে অনুতপ্ত হতে হতে পারে। মুক্তির পর সিনেমাটি দর্শকের প্রশংসা পেতে শুরু করলে ওই প্রযোজকই পরিচালকের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে দিতে রাজকান্তকে ফোন করেন।
২০২৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ‘প্রেমাদা উরাল্লি’। ছবিটির সাফল্য শুধু বক্স অফিসের আয়ে সীমাবদ্ধ নয়; আর্থিক সংকট, সীমিত প্রচার এবং দীর্ঘদিন কাজের সুযোগ না পাওয়া একজন পরিচালকের প্রত্যাবর্তনের গল্পও সিনেমাটিকে আলোচনায় এনেছে।
পরিচালক মনোজ কুমারের প্রথম সিনেমা ‘অক্ষি’ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছিল। তবে সেই স্বীকৃতির পরও দীর্ঘ পাঁচ বছর নতুন সিনেমা নির্মাণের সুযোগ পাননি তিনি। দ্বিতীয় ছবি ‘প্রেমাদা উরাল্লি’ নির্মাণ করতে গিয়েও তাঁকে পড়তে হয় তীব্র অর্থসংকটে। একপর্যায়ে শুটিং শেষ করার অর্থ জোগাড় করতে মায়ের মঙ্গলসূত্র বন্ধক রাখার কথাও ভাবতে হয়েছিল তাঁকে।
প্রথমে ছবিটির বাজেট ধরা হয়েছিল প্রায় এক কোটি রুপি। পরে শুটিং ও অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় পরিচিতজনদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে হয়। কেউ ১০ লাখ, কেউ ২০ লাখ রুপি করে বিনিয়োগ করেন। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ জন বিনিয়োগকারী প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত হন বলে জানিয়েছেন চিত্রগ্রাহক রাজকান্ত।
সীমিত বাজেটেও নির্মাণের মান ধরে রাখতে নানা কৌশল অবলম্বন করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। রাজকান্তের পরিচিতির সূত্রে ক্যামেরা ও অন্যান্য সরঞ্জাম ভাড়ায় ছাড় পাওয়া যায়। যেসব সরঞ্জামের দৈনিক ভাড়া ছিল ৩০ হাজার রুপি, সেগুলো পাওয়া যায় ১৫ হাজার রুপিতে। শতাধিক সদস্যের শুটিং দলের থাকার ব্যবস্থাও করা হয় ভাড়া করা একটি অনুষ্ঠানস্থলে। তবে অভিনেতাদের জন্য ছিল আলাদা আবাসন।
সিনেমার নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় মুক্তি ও প্রচার। বড় কোনো তারকা না থাকায় প্রযোজকদের আগ্রহ ছিল সীমিত। প্রচারের জন্যও পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না।
এ পরিস্থিতিতে প্রচলিত বিজ্ঞাপনের বাইরে গিয়ে অভিনব উদ্যোগ নেন পরিচালক মনোজ কুমার। বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রের আদলে কার্ড ছাপিয়ে দর্শকদের সিনেমাটি দেখার আমন্ত্রণ জানানো হয়। বাস, ট্রেন, বাসস্ট্যান্ড ও মন্দিরসহ জনসমাগমপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে মানুষের হাতে এসব কার্ড তুলে দেওয়া হয়। নির্মাতাদের অনুরোধ ছিল, অন্তত একবার যেন দর্শকেরা সিনেমাটি দেখেন।
এ ছাড়া কর্ণাটকের বিভিন্ন এলাকায় অটোরিকশার পেছনে লাগানো হয় আলোকপ্রতিফলক স্টিকার। রাজকান্তের তথ্য অনুযায়ী, এ জন্য ১০ হাজারের বেশি স্টিকার ছাপানো হয়েছিল। বড় বাজেটের প্রচার ছাড়াই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর এই উদ্যোগ ছবিটি নিয়ে আগ্রহ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
মুক্তির প্রথম দিনে ‘প্রেমাদা উরাল্লি’ প্রদর্শিত হয় মাত্র ৬০টি শোতে। প্রথম দিনের আয় ছিল প্রায় ৯ লাখ রুপি। তবে দ্বিতীয় দিন থেকেই দর্শকের আগ্রহ বাড়তে শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা এবং দর্শকদের মুখে মুখে প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রেক্ষাগৃহমালিক ও পরিবেশকেরাও ছবিটি নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ফলে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে প্রদর্শনীর সংখ্যা।
বক্স অফিসের হিসাব প্রকাশকারী প্রতিষ্ঠান স্যাকনিল্কের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত ছবিটির বিশ্বব্যাপী মোট আয় প্রায় ১১৭ কোটি রুপি ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর ২৩ অক্টোবরের প্রতিবেদনে আয় ১০৭ কোটি রুপির বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবের পদ্ধতি ও হালনাগাদের সময় ভিন্ন হওয়ায় আয়ের অঙ্কে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
‘প্রেমাদা উরাল্লি’ গ্রামীণ পটভূমিতে নির্মিত প্রেম ও পারিবারিক সম্পর্কের গল্প। সিনেমায় নাগান্নার বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছেন রঙ্গায়ন রঘু। ছেলেকে নিয়ে গ্রামে তাঁর সংসার। ছেলের জন্য শিক্ষিত পুত্রবধূ খুঁজতে গিয়ে পরিবারে নানা জটিলতা তৈরি হয়। ছেলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন শ্রী রাম। আরও রয়েছেন রামিকা শিবু ও তাপস্বিনী পুনাচ্চা।
প্রেমের পাশাপাশি কৃষিজীবন, পারিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সম্পর্কের টানাপোড়েন উঠে এসেছে ছবিটিতে। কর্ণাটকের হাসান অঞ্চলের সবুজ প্রকৃতি সিনেমার দৃশ্যায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্ষার আবহকে গল্পের আবেগের সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন নির্মাতারা।
‘প্রেমাদা উরাল্লি’র সাফল্য দেখিয়েছে, বড় তারকা কিংবা বিপুল প্রচার ব্যয় ছাড়াও দর্শকের কাছে পৌঁছানো সম্ভব। শক্তিশালী গল্প, দর্শকের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া এবং সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে সৃজনশীল প্রচেষ্টা একটি সিনেমার বাণিজ্যিক সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যে ছবির অর্থ জোগাড় করা এবং মুক্তি নিশ্চিত করাই ছিল নির্মাতাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, সেটিই এখন কন্নড় চলচ্চিত্রের আলোচিত বক্স অফিস সাফল্যগুলোর একটি। আর দীর্ঘদিন কাজের সুযোগের অপেক্ষায় থাকা পরিচালক মনোজ কুমারও ফিরে এসেছেন আলোচনার কেন্দ্রে।