নিজ কার্যালয়ে রোববার (২৫ অক্টোবর) সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন ও আইনি প্রতিকারের ব্যবস্থা রয়েছে। তাই কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে আইন অনুযায়ী তাঁর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আবার কেউ অন্যায়ের শিকার হলে তাঁকেও নিরপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
টঙ্গীর মধ্য আউচপাড়া এলাকার ‘ক্বরীউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায়’ সাত বছর বয়সী এক ছাত্রীর সঙ্গে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এবং ওই ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধরের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কারওই নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া উচিত নয়। শিক্ষকদের প্রতি মানুষের যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা, তা যেন কোনো আচরণের কারণে বিন্দুমাত্র নষ্ট না হয়ে যায়।’
অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, শিশু-কিশোরেরা যেন কোনো অবস্থাতেই নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কাছে অনিরাপদ বোধ না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৯ অক্টোবর সোমবার টঙ্গীর মধ্য আউচপাড়া এলাকার ওই মাদ্রাসার নিচতলার সিঁড়িতে প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া সাত বছর বয়সী শিশুটিকে যৌন নিপীড়ন করা হয়। ঘটনার পর শিশুটি মাদ্রাসায় যেতে অনীহা প্রকাশ করে। পরিবারের সদস্যরা কারণ জানতে চাইলে প্রথমে সে কিছু জানায়নি। পরে মা-বাবার কাছে ঘটনার কথা জানায় শিশুটি।
এরপর ২১ অক্টোবর দুপুরে শিশুটির স্বজনেরা মাদ্রাসায় গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ সময় তাঁকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে ঘটনাটি জানাজানি হলে স্থানীয় লোকজনও সেখানে জড়ো হন।
অভিযুক্ত শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধরের কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে ২৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে কয়েকজনকে ওই শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ করতে দেখা যায়। ভিডিওতে শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়। একপর্যায়ে শিশুটির স্বজনদের কয়েকজন তাঁকে থাপ্পড় মারেন এবং মারধর করেন।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই শিক্ষককে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। মামলায় গ্রেপ্তারের পর অভিযুক্ত শিক্ষককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ আলমাছ হোসেন অভিযোগ করেছেন, শিশুটির বাবার নেতৃত্বে ১৫ থেকে ১৬ জনের একটি দল মাদ্রাসায় প্রবেশ করে ওই শিক্ষককে মারধর করে। তাঁকে রক্ষা করতে গেলে অন্য শিক্ষক-শিক্ষিকা ও নিরাপত্তাকর্মীরাও মারধরের শিকার হন বলে দাবি করেন তিনি।
এ ছাড়া মাদ্রাসার কার্যালয় ভাঙচুর, ১৭ লাখ টাকা ও পাঁচটি মুঠোফোন লুটের অভিযোগও করেছেন অধ্যক্ষ। এসব অভিযোগের বিষয়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ থানায় পৃথক অভিযোগ দিয়েছে। তবে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
ঘটনাটি নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘এর জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি বিধান আছে। আইনি প্রতিকার আছে। আমার একটাই মাত্র আহ্বান থাকবে, যদি কোনো কারণে কোনো ব্যক্তি অপরাধ করে থাকেন, সেই অপরাধের জন্য তিনি শাস্তি ভোগ করবেন। যদি কোনো কারণে তিনি অন্যায়ের শিকার হন, তাহলে তিনি নিরপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষকদের মূল ভূমিকা লোকো প্যারেন্টিস। অর্থাৎ, পিতা-মাতার যে ভূমিকা, শিক্ষকরা সেই ভূমিকা পালন করে থাকেন। একটা বা দুইটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়েও সমস্ত শিক্ষকসমাজকে লক্ষ্যবস্তু করাটা উচিত হবে না।’
শিশুর প্রতি কোনো ধরনের অনিষ্টের আশঙ্কায় মা-বাবার আবেগের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সন্তানের ক্ষতি হলে মা-বাবার আবেগপ্রবণ হয়ে পড়া স্বাভাবিক। তবে পুরো ঘটনার নিষ্পত্তি আইনের কাঠামোর মধ্যেই হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল আরও জানান, গাজীপুরের এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং সেটি তদন্তাধীন রয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় আদালত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ঘটনার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী অপরাধের বিচার। এই তিনটি বিষয়ই এখন ঘটনাটির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো ঘটনা প্রতিরোধ করাও জরুরি।