বিদেশের মাটিতে একের পর এক দুর্দান্ত বোলিং করে আগেই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন হাসান মাহমুদ। পাকিস্তান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাত—ভিন্ন ভিন্ন দেশের কন্ডিশনে ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন বাংলাদেশের এই পেসার। তবে এত দিন একটি আক্ষেপ ছিল তাঁর। দেশের মাটিতে কখনো ইনিংসে পাঁচ উইকেট পাওয়া হয়নি। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটল সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে চলমান টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো দেশের মাটিতে পাঁচ উইকেট পাওয়ার কীর্তি গড়েছেন হাসান। তাঁর দুর্দান্ত বোলিংয়ে ক্যারিবীয়দের প্রথম ইনিংস থেমেছে ৩৫৬ রানে। ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের ইতিহাসেও নতুন অধ্যায় যোগ করেছেন তিনি।
এর আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে রাওয়ালপিন্ডি, ভারতের বিপক্ষে চেন্নাই, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইন এবং আফগানিস্তানের বিপক্ষে আবুধাবিতে ইনিংসে পাঁচ উইকেট পেয়েছিলেন হাসান। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো নিজের দেশ বাংলাদেশ। পাঁচটি ভিন্ন দেশের মাটিতে টেস্টে প্রথম পাঁচবার ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়ার বিরল কীর্তিতেও নাম লিখিয়েছেন তিনি। এর আগে এমন অর্জন ছিল কেবল অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ স্পিনার নাথান লায়নের।
দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে নিজের অনুভূতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশের মাটিতে ৫ উইকেট পাওয়াটা সব সময় আমার জন্য খুব স্পেশাল। যেহেতু নিজেদের মাঠে ভালো একটা সুযোগ ছিল, তাই এটা (করতে পারাটা) অনেক আনন্দের।’
তবে ব্যক্তিগত রেকর্ড নিয়ে খুব বেশি উচ্ছ্বাসে ভাসতে চান না এই পেসার। বরং সামনে আরও ভালো করার লক্ষ্য তাঁর। হাসানের ভাষায়, ‘আমি বিষয়গুলো খুব সহজভাবে দেখি। সামনে আরও বড় কিছু অর্জনের চেষ্টা করে যাব। যত দিন টেস্ট ক্রিকেট খেলব, তত দিনই চেষ্টা থাকবে আরও ভালো করার। ৫ উইকেট পাওয়া সব সময়ই বিশেষ কিছু। ভবিষ্যতেও এমন অর্জনের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাব।’
শুধু পাঁচ উইকেট কিংবা ছয় উইকেট নেওয়ার কীর্তিই নয়, এদিন বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে আরও একটি বিরল ঘটনার সাক্ষী হয়েছে সিলেট। প্রথমবারের মতো কোনো বাংলাদেশি পেসারের বলে স্টাম্পিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। হাসান মাহমুদের বলে জশুয়া বিশপকে স্টাম্পিং করেছেন উইকেটকিপার লিটন দাস।
ঘটনাটির পেছনে ছিল অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর বুদ্ধিদীপ্ত পরিকল্পনা। ব্যাটসম্যান ক্রিজ ছেড়ে কিছুটা এগিয়ে এসে খেলছিলেন। বিষয়টি লক্ষ্য করে কৌশল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন শান্ত। হাসানকে তিনি পরামর্শ দেন, লিটন যদি উইকেটের কিছুটা সামনে দাঁড়িয়ে কিপিং করেন, তাহলে ব্যাটসম্যানের পায়ের মুভমেন্টে পরিবর্তন আসতে পারে। এতে তাঁর শট খেলার প্রবণতাও কমে যেতে পারে।
অধিনায়কের পরিকল্পনায় সম্মতি জানান হাসান। এরপর লিটনকে বিষয়টি জানানো হলে তিনিও তাতে রাজি হন। শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি কাজে দেয়। হাসানের বলে এগিয়ে এসে খেলতে গিয়ে স্টাম্পিংয়ের শিকার হন জশুয়া বিশপ। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে পেসারের বলে প্রথম স্টাম্পিংয়ের ঘটনাটি তাই ম্যাচের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত হয়ে থাকবে।
বোলারদের দারুণ পারফরম্যান্সের পর বাংলাদেশের সামনে সুযোগ ছিল ব্যাট হাতে ম্যাচে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার। কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণের পথে শুরুতেই হোঁচট খায় স্বাগতিকেরা। দ্রুত কয়েকটি উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে বাংলাদেশ।
দিনের শেষ দিকে অবশ্য কিছুটা প্রতিরোধ গড়েছেন অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম ও তাওহিদ হৃদয়। দুজনের অবিচ্ছিন্ন ৩৭ রানের জুটিতে কিছুটা স্বস্তি নিয়ে দিনের খেলা শেষ করে বাংলাদেশ। তবে ৭ উইকেট হাতে থাকলেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসের চেয়ে এখনো ২৬৮ রানে পিছিয়ে রয়েছে স্বাগতিকেরা।
ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে তৃতীয় দিনে বড় ইনিংস খেলতে হবে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের। বিশেষ করে মুশফিক ও হৃদয়ের জুটির ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে দলের পরবর্তী অবস্থান। হাসানও মনে করেন, এই জুটি টিকে থাকলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের।
সংবাদ সম্মেলনে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, এখন যে জুটিটা হয়েছে মুশফিক ভাই ও হৃদয়ের, যদি এটা ধরে রাখতে পারে, তাহলে আমরা লিড নিতে পারব। আশা করি, ওদের রান টপকে যেতে পারব।’
উইকেটের আচরণ নিয়েও ইতিবাচক হাসান। তাঁর মতে, এখন পর্যন্ত ব্যাটিংয়ের জন্য উইকেট ভালো। পেস কিংবা স্পিন—কোনোটিই ব্যাটসম্যানদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়নি। তবে নতুন বলে শুরুর দিকে কিছুটা চ্যালেঞ্জ ছিল। মনোযোগ ধরে রেখে খেলতে পারলে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে পারবেন বলে বিশ্বাস তাঁর।
সব মিলিয়ে সিলেট টেস্টের দিনটি হাসান মাহমুদের জন্য হয়ে থাকল স্মরণীয়। দেশের মাটিতে প্রথম পাঁচ উইকেট, এক ইনিংসে ছয় শিকার এবং বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে পেসারের বলে প্রথম স্টাম্পিং—এক ম্যাচেই একাধিক অর্জনের সাক্ষী হলেন তিনি। এখন ব্যক্তিগত সাফল্যের আনন্দের সঙ্গে দলীয় সাফল্যও যোগ করতে চান এই পেসার।