শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে কলেজের মূল ফটকের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা দুই দফা দাবি তুলে ধরেন। এর আগে সকাল থেকেই কলেজের সামনের সড়কের দুই পাশে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন তারা। এতে নীলক্ষেত মোড় থেকে আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ওই এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা জানান, বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাতে কলেজে ঘটে যাওয়া পুলিশি অভিযানে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। এ জন্য আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তাদের শনাক্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয় দাবি অধ্যক্ষ ড. মেহেরুন নেছার পদত্যাগসংক্রান্ত। আন্দোলনকারীরা তাঁকে কলেজ ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে তাঁর পদত্যাগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত কলেজের সব প্রশাসনিক কার্যক্রম, ক্লাস ও পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।
শিক্ষার্থীরা আরও জানান, তাঁদের দাবি পূরণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি বাস্তবায়ন না হলে পরবর্তী সময়ে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
আন্দোলনের সূত্রপাত যেভাবে
কলেজের শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের সূত্রপাত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, অসদাচরণ এবং আবাসিক হলের আসন বাতিলের হুমকির অভিযোগ তুলে তাঁর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থী ও কলেজ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, দুর্গাপূজার ছুটির আগে কলেজের পাঁচটি বিভাগের স্নাতকোত্তর শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা একটি বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। কলেজের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠান রাত ১০টার মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরে শিক্ষার্থীদের অনুরোধে সময় বাড়িয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত করা হয়। তবে অনুষ্ঠান শেষ পর্যন্ত ভোর ৫টা পর্যন্ত চলে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এ ঘটনার পর অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত দুই শিক্ষার্থীর আবাসিক হলের আসন বাতিল করেন অধ্যক্ষ। পরে তাঁরা ক্ষমা চাইতে গেলে আসন পুনর্বহালের শর্ত হিসেবে এক রাতের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ বাবদ ১২ হাজার ৬০০ টাকা দাবি করা হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অধ্যক্ষ মেহেরুন নেছা। তাঁর বক্তব্য, অনুষ্ঠান মধ্যরাত পর্যন্ত করার অনুমতি দেওয়া হলেও শিক্ষার্থীরা ভোর পর্যন্ত অনুষ্ঠান চালিয়েছেন। এতে শৃঙ্খলা ভঙ্গ হয়েছে এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ আদায়ের জন্য তিনি নোটিশ দিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, শিক্ষার্থীরা ঘটনার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরছেন না।
১৩ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর অধ্যক্ষকে উদ্ধার
এ ঘটনার জেরে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে অধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে তাঁকে কার্যালয়ের ভেতরে অবরুদ্ধ করে দরজায় তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। প্রায় ১৩ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর রাত সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে।
তবে পুলিশি অভিযানের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। আন্দোলনকারীদের দাবি, পুলিশ সদস্যরা তাঁদের ওপর হামলা চালান। কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। এক নারী শিক্ষার্থীর চুল ও হিজাব ধরে টানাটানি এবং হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করার অভিযোগও করেছেন তাঁরা। আহতদের কয়েকজনকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।
অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ জামিল হোসেনের ভাষ্য, অধ্যক্ষকে উদ্ধার করার সময় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের দুই দফা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। তাঁর দাবি, অভিযানে থাকা নারী পুলিশ সদস্যদেরও শিক্ষার্থীদের আঘাতে কয়েকজন আহত হয়েছেন। অধ্যক্ষকে উদ্ধারের সময় তিনি নিরাপদ ছিলেন এবং পরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।
পুলিশের অভিযান ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে শুক্রবার দ্বিতীয় দিনের মতো আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দাবি, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।