আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে পানি সংরক্ষণ, বন্যার ঝুঁকি কমানো, জলাভূমি পুনরুজ্জীবিত করা এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বুধবার বিকেলে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিল চেম্বারে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জলবায়ু পদক্ষেপ ও ন্যায্য উত্তরণ’ বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভায় এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, পানি সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা ব্যারেজের মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান ০.৫ শতাংশেরও কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে দেশটি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
তারেক রহমান বলেন, এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ১২ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। এতে কোটি কোটি মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ শতাংশের সমান বলেও উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তাও গুরুতর ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুতের চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পাটজাত পণ্য, পরিবেশবান্ধব পরিবহন, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন এবং সার্কুলার অর্থনীতির উদ্যোগসহ সবুজ শিল্পের প্রসার ঘটানো হচ্ছে।
তিনি জানান, বাংলাদেশ একটি জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলার কাজও করছে। তবে এসব লক্ষ্য এককভাবে অর্জন করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ‘অভিন্ন কিন্তু পৃথক দায়িত্ব ও নিজ নিজ সক্ষমতা’ নীতির ভিত্তিতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়া এখন অপরিহার্য।
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এগুলো হলো –
১. প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী প্রাক্-শিল্পযুগের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখতে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে হবে।
২. জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অভিযোজন খাতে পূর্বানুমেয় ও সহজলভ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
৩. জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তিতে আরও বেশি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক জলবায়ু উত্তরণে সহায়তা করতে হবে।
৪. সহজলভ্য অর্থায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ করতে হবে।
৫. ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান তহবিলের পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিতভাবে এ তহবিল পুনঃপূরণ করতে হবে।
জাতিসংঘের এ উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং টেকসই ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল প্যারিস চুক্তির বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বাস্তবভিত্তিক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা।
এতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।