রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের (১৯) মৃত্যুর ঘটনায় তার কক্ষ থেকে হাতে লেখা বেশ কয়েকটি চিরকুট উদ্ধার করেছে পুলিশ। চিরকুটগুলোতে সম্পর্ক, বিশ্বাসভঙ্গ, ভালোবাসা ও ক্ষোভসংক্রান্ত বিভিন্ন বক্তব্য রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটের একটি কক্ষ থেকে মরিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে পুলিশ ওই কক্ষে তল্লাশি চালিয়ে বিভিন্ন কাগজে হাতে লেখা চিরকুটগুলো জব্দ করে।
পুলিশ জানিয়েছে, চিরকুটগুলো মরিয়ম মৃত্যুর আগে নিজেই লিখেছিলেন কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। এর মধ্যে কয়েকটি সাদা কাগজে কালো ও লাল কালিতে লেখা। একটি চিরকুটে ‘বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ’ লেখা প্যাডও পাওয়া গেছে।
উদ্ধার করা চিরকুটগুলোতে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে মরিয়মের ক্ষোভ, অভিমান, ভালোবাসা ও বিশ্বাসভঙ্গের কথা উঠে এসেছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
কিছু লেখায় সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং অন্য একজনের সঙ্গে সম্পর্ক ভাগাভাগি করতে না চাওয়ার মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। আবার কয়েকটি চিরকুটে বিশ্বাস করে প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ ও ক্ষোভের কথা রয়েছে। একটি লেখায় সম্পর্কের মধ্যে নিজেকে ব্যবহৃত হওয়ার মতো অবস্থানে থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
তবে এসব চিরকুটের বক্তব্যের সত্যতা, লেখকের পরিচয় এবং এগুলো মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি কোনোভাবে সম্পর্কিত কি না। তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশ জানিয়েছে, মরিয়মের মরদেহ উদ্ধারের সময় ফ্ল্যাটে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমও ছিলেন। তাঁরা মরিয়ম যে কক্ষে ছিলেন, তার পাশের কক্ষে অবস্থান করছিলেন বলে পুলিশকে জানানো হয়েছে।
ঘটনার পর পুলিশ এমপি ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয়। পরে মরিয়মের বাবার করা মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ রোববার রাতে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম এবং মরিয়মের শ্যালক ওবায়দুল্লাহকে আসামি করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান জানান, মামলার পর গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এর আগে তাঁদের পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল।
মামলায় আনা অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
মরিয়মের মরদেহ উদ্ধারের পর আইন অনুযায়ী সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্ত ও তদন্তের অন্যান্য আলামত গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা চিরকুটসহ অন্যান্য আলামতও তদন্তের অংশ হিসেবে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
গাজী নজরুল ইসলাম সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হন। এর আগে জুলাই মাসে তাঁর একটি ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়।
পরে জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক তদন্তের কথা জানিয়ে ২২ জুলাই গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়। দলটির বিজ্ঞপ্তিতে সাংগঠনিক তদন্তে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ার কথা বলা হয় এবং তাঁর বহিষ্কারের বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে জানানোর সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়।
বর্তমানে মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত চলছে। চিরকুট, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের আলামত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে তদন্তে মৃত্যুর কারণ ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা নির্ধারণ করা হবে।