ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী টাটা গ্রুপের মূল হোল্ডিং কোম্পানি টাটা সন্সের নেতৃত্ব ও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। কোম্পানির চেয়ারম্যান এন চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগ এবং রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভাব্য আইপিও নিয়ে টাটা সন্সের পরিচালনা পর্ষদ ও বৃহত্তম শেয়ারহোল্ডার টাটা ট্রাস্টসের অবস্থান পরস্পরবিরোধী হয়ে উঠেছে।
টাটা সন্সের প্রায় ৬৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক টাটা ট্রাস্টস। অন্যদিকে কোম্পানিটির প্রায় ১৮.৩৭ শতাংশ শেয়ার রয়েছে শাপুরজি পালোনজি (এসপি) গ্রুপের হাতে। ফলে মালিকানা, পরিচালন কাঠামো এবং কোম্পানির ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক এই বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুটি বিষয়। এন চন্দ্রশেখরনের আরও পাঁচ বছরের জন্য চেয়ারম্যান হিসেবে পুনর্নিয়োগ এবং টাটা সন্সকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার সম্ভাবনা।
চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগে আপত্তি
টাটা সন্সের পরিচালনা পর্ষদ ১৭ সেপ্টেম্বর এন চন্দ্রশেখরনকে আরও পাঁচ বছরের জন্য চেয়ারম্যান হিসেবে পুনর্নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৭ সাল থেকে টাটা সন্সের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে টাটা ট্রাস্টস আপত্তি জানিয়েছে। ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান নোয়েল টাটার নেতৃত্বাধীন পক্ষের বক্তব্য, চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগের প্রক্রিয়ায় কোম্পানির গঠনতন্ত্র ও পরিচালনা কাঠামো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ট্রাস্টস সিদ্ধান্তটিকে বৈধ নয় বলে অভিহিত করেছে।
টাটা ট্রাস্টসের আপত্তির আরেকটি কারণ হলো বয়সসংক্রান্ত নীতি। ট্রাস্টসের বক্তব্য অনুযায়ী, কোম্পানির করপোরেট নীতিতে ৬৫ বছরের বেশি বয়সে নির্বাহী পদে থাকার বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। চন্দ্রশেখরন ২০২৮ সালে ৬৫ বছর পূর্ণ করবেন। ফলে তাঁর পাঁচ বছরের নতুন মেয়াদ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ট্রাস্টস।
তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি। টাটা সন্সের শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন এবং কোম্পানির গঠনতন্ত্রে পরিচালনা পর্ষদ ও শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষমতার ব্যাখ্যাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আইপিও নিয়ে কেন এত বিরোধ
টাটা সন্সের সম্ভাব্য আইপিও বিতর্কের পেছনে মূল ভূমিকা রাখছে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরবিআইয়ের নিয়ন্ত্রক কাঠামো।
২০২২ সালে আরবিআই টাটা সন্সকে ‘আপার লেয়ার’নন-ব্যাংকিং ফাইন্যান্সিয়াল কোম্পানি বা এনবিএফসি-ইউএল হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে। এই শ্রেণির প্রতিষ্ঠানের ওপর বাড়তি নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যার মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত।
টাটা সন্স অবশ্য এই বাধ্যবাধকতা এড়ানোর চেষ্টা করেছে। কোম্পানিটি তার আর্থিক কাঠামো পরিবর্তন এবং ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক শ্রেণিবিন্যাস থেকে বেরিয়ে আসার আবেদন করেছিল। কিন্তু চলতি মাসে আরবিআই সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে।
এর ফলে টাটা সন্সের সামনে তালিকাভুক্তির চাপ আরও বেড়েছে। আরবিআইয়ের সিদ্ধান্তের পর কোম্পানির সম্ভাব্য আইপিও নিয়ে বাজারে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
ট্রাস্টসের অবস্থান আলাদা
টাটা ট্রাস্টস দীর্ঘদিন ধরে টাটা সন্সকে বেসরকারি কাঠামোর মধ্যে রাখার পক্ষে। ট্রাস্টসের যুক্তি, টাটা গ্রুপের বর্তমান মালিকানা কাঠামো শুধু ব্যবসায়িক মুনাফার ওপর নির্ভরশীল নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বৃহৎ সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড।
টাটা ট্রাস্টসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টাটা সন্স থেকে পাওয়া লভ্যাংশের অর্থ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গবেষণা ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হয়। ট্রাস্টসের আশঙ্কা, টাটা সন্স তালিকাভুক্ত হলে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের প্রত্যাশা ও বাজারের চাপ কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে।
১৭ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক বিবৃতিতে টাটা ট্রাস্টস জানায়, টাটা সন্সের তালিকাভুক্তির পরিবর্তে অন্যান্য সম্ভাব্য পথও বিবেচনা করা উচিত। ট্রাস্টসের বক্তব্য, টাটা মডেলের মূল বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করা জরুরি।
এখানেই পর্ষদের সঙ্গে ট্রাস্টসের অবস্থানের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আরবিআইয়ের নির্দেশনা মেনে চলার প্রয়োজনীয়তার কথা মাথায় রেখে পর্ষদ তালিকাভুক্তির প্রস্তুতির দিকে এগোতে চাইছে। বিপরীতে ট্রাস্টস তালিকাভুক্তির বিকল্প খুঁজে দেখার পক্ষে।
এসপি গ্রুপের শেয়ারও গুরুত্বপূর্ণ
টাটা সন্সের সম্ভাব্য আইপিও বিতর্কে এসপি গ্রুপের অংশীদারিত্বও গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ১৮.৩৭ শতাংশ শেয়ার নিয়ে তারা কোম্পানিটির সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডার।
এসপি গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে টাটা সন্সে থাকা তাদের বিনিয়োগ থেকে তারল্য পাওয়ার চেষ্টা করছে। টাটা ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান নোয়েল টাটা সম্প্রতি এসপি গ্রুপকে শেয়ার বিক্রির সুযোগ করে দেওয়ার একটি প্রস্তাব বোর্ডে উত্থাপন করেন।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এসপি গ্রুপ টাটা সন্সের কিছু শেয়ার বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে। ফলে সম্ভাব্য আইপিও ছাড়াও শেয়ারহোল্ডিং কাঠামো পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি সামনে এসেছে।
তালিকাভুক্ত হলে কী বদলাবে
টাটা সন্স শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে কোম্পানিটির পরিচালনা ও আর্থিক তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে নতুন ধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন, গুরুত্বপূর্ণ করপোরেট সিদ্ধান্ত এবং শেয়ারহোল্ডারদের জন্য প্রাসঙ্গিক তথ্য প্রকাশ করতে হবে।
এতে কোম্পানির মূল্যায়নও প্রকাশ্য বাজারের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি বাড়বে।
তবে তালিকাভুক্তির অর্থ এই নয় যে টাটা ট্রাস্টসের ৬৬ শতাংশ মালিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যাবে। নতুন শেয়ার ইস্যু, বিদ্যমান শেয়ার বিক্রি এবং আইপিওর কাঠামোর ওপর মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তন নির্ভর করবে।
সামনে আইনি লড়াইয়ের সম্ভাবনা
টাটা সন্সের বিরোধ এখন শুধু বোর্ডরুমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই। আরবিআই ইতিমধ্যে বোম্বে হাইকোর্টে একটি ‘কেভিয়েট’ দাখিল করেছে। এর অর্থ, টাটা সন্সের তালিকাভুক্তি-সংক্রান্ত কোনো আইনি পদক্ষেপ হলে আদালত যেন আরবিআইয়ের বক্তব্য শোনার সুযোগ দেয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগাম পদক্ষেপ নিয়েছে।
অন্যদিকে চেয়ারম্যানের পুনর্নিয়োগ নিয়েও টাটা ট্রাস্টসের আপত্তি রয়েছে। ফলে কোম্পানির গঠনতন্ত্র, পরিচালনা পর্ষদের ক্ষমতা এবং বৃহত্তম শেয়ারহোল্ডারের অধিকার নিয়ে আইনি প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।
টাটা গ্রুপের আকার বিবেচনায় এই বিরোধের প্রভাব শুধু টাটা সন্সে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা নেই। টাটা সন্স টাটা গ্রুপের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানির মূল হোল্ডিং প্রতিষ্ঠান। গাড়ি, তথ্যপ্রযুক্তি, ইস্পাত, বিদ্যুৎ, হোটেল, ভোক্তা পণ্য ও বিমান পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে গ্রুপটির ব্যবসা রয়েছে।
ফলে টাটা সন্সের মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামো নিয়ে বিরোধ দীর্ঘায়িত হলে তা গ্রুপের বিভিন্ন কোম্পানি, বিনিয়োগকারী এবং ভারতের পুঁজিবাজারে আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।
সব মিলিয়ে টাটা সন্স এখন এক জটিল করপোরেট সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে আরবিআইয়ের নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা ও তালিকাভুক্তির চাপ, অন্যদিকে রয়েছে টাটা ট্রাস্টসের মালিকানা ও দীর্ঘদিনের পরিচালন দর্শন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চেয়ারম্যানের পুনর্নিয়োগ এবং এসপি গ্রুপের অংশীদারিত্বের প্রশ্ন।
পরবর্তী সময়ে শেয়ারহোল্ডারদের সিদ্ধান্ত, নিয়ন্ত্রক সংস্থার পদক্ষেপ এবং সম্ভাব্য আইনি প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করবে টাটা সন্স কোন পথে এগোবে। ১৫০ বছরের বেশি সময় ধরে টিকে থাকা টাটা মডেলের ভবিষ্যৎ পরিচালন কাঠামো নিয়ে তাই ভারতের করপোরেট অঙ্গনে এখন গভীর আগ্রহ তৈরি হয়েছে।