জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র সফরে থাকা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিউইয়র্ক পৌঁছেছেন। ইস্তাম্বুলে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতির পর প্রধানমন্ত্রী, তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং সফরসঙ্গীদের বহনকারী টার্কিশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট স্থানীয় সময় সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন জুবাইদা খান এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে প্রধানমন্ত্রীকে ম্যানহাটনের ‘হাইয়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক’ হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সফরকালে তিনি ওই হোটেলেই অবস্থান করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে নিউইয়র্কের বিভিন্ন এলাকায় প্রবাসী বাংলাদেশি ও বিএনপির নেতা-কর্মীরা জড়ো হন। বিশেষ করে বাংলাদেশি অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটস এলাকায় ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন নিয়ে কর্মসূচি পালন এবং স্লোগান দিতে দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর যাওয়ার সময় উপস্থিত লোকজনকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান তিনি।
৩৮ সদস্যের প্রতিনিধিদল
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল অংশ নিচ্ছে। সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিনিধিদলে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানসহ মোট ৩৮ জন রয়েছেন। প্রতিনিধিদলে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান রয়েছেন। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে অধিবেশনের কার্যক্রমে সভাপতিত্ব করবেন।
এ ছাড়া পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও শামা ওবায়েদ ইসলাম, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদি আমিন ও রেহান আসিফ আসাদ এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন প্রতিনিধিদলে রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু আবদুল্লাহ এম সালেহ (সালেহ শিবলী), অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতীকুর রহমান রুমন এবং পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামও সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন।
শুরু হচ্ছে ব্যস্ত কূটনৈতিক কর্মসূচি
নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি শুরু হচ্ছে ২২ সেপ্টেম্বর। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দেওয়া রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাঁদের স্বামী-স্ত্রীদের সম্মানে আয়োজিত স্বাগত প্রাতরাশে অংশ নেবেন তিনি। এরপর ৮১তম সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী কার্যক্রমে যোগ দেবেন। সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আয়োজিত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সংবর্ধনাতেও তাঁর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
এ সময় বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় ও সৌজন্য সাক্ষাতের কর্মসূচিও রয়েছে। সূচি অনুযায়ী, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এবং হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ে ফিলজ-এমের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের কথা রয়েছে।
এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তা, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহ এবং মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্কের সঙ্গেও তাঁর বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট ও জলবায়ু আলোচনায় গুরুত্ব
২৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে রোহিঙ্গা সংকট বিশেষ গুরুত্ব পাবে। বাংলাদেশ আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে তিনি অংশ নেবেন, যার বিষয় ‘দীর্ঘায়িত বাস্তুচ্যুতি থেকে টেকসই সমাধান, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতাসহ রোহিঙ্গা সংকটের নতুন আহ্বান’। সেখানে মিয়ানমারে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের টেকসই ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
একই দিন জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান, জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ক্ষয়ক্ষতির অর্থায়ন এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়গুলো আলোচনায় আসার কথা রয়েছে।
২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে ভাষণ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ দেবেন। এটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তাঁর প্রথম ভাষণ। বর্তমান সূচি অনুযায়ী, নিউইয়র্ক সময় বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে এবং বক্তব্যের জন্য প্রায় ১৫ মিনিট সময় বরাদ্দ রয়েছে। সময়সূচিতে পরিবর্তন হতে পারে।
তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নারী ও যুব ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট এবং বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংস্কারের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে বলে সফরসূচি ও সরকারি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
জাতিসংঘের এবারের সাধারণ বিতর্কের মূল প্রতিপাদ্য ‘Restoring trust, managing transformation: a United Nations that delivers for all’ – বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়, ‘আস্থা পুনর্গঠন, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’। ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্ক ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়েও আলোচনা
২৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত হুমকি নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন এবং সেখানে উদ্বোধনী বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশের মতো উপকূলীয় ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলবায়ু অভিযোজন ও আন্তর্জাতিক সহায়তার বিষয়গুলো এ ধরনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘের নির্ধারিত কর্মসূচিতে ২৪ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের কথা উল্লেখ রয়েছে।
এদিন মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি নিয়ে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানেও প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনী বক্তব্য দেবেন। সেখানে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফারি সেবার গুরুত্ব এবং মাতৃ ও শিশুমৃত্যু কমানোর বিষয়ে বাংলাদেশের উদ্যোগ তুলে ধরার কথা রয়েছে।
বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেরও কর্মসূচি রয়েছে। এর মধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফ, ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই প্লেনকোভিচ, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী এবং হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে।
এসব বৈঠকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যু এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় আলোচনায় আসতে পারে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে।
২৫ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরার প্রস্তুতি
২৫ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক রয়েছে। জেপিমরগানের সদর দপ্তরে আয়োজিত ওই প্রাতরাশ বৈঠকে তিনি অংশ নেবেন। একই দিন কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট প্রিন্স জায়েদ আল হুসাইনের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ বৈঠকের কথা রয়েছে।
সফরসূচি অনুযায়ী, ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক সময় রাত ১১টায় এমিরেটসের ইকে-২০২ ফ্লাইটে দুবাই হয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা প্রধানমন্ত্রীর। ২৭ সেপ্টেম্বর তাঁর ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য বহুপক্ষীয় কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা নিউইয়র্কে সমবেত হয়েছেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ বিতর্কে ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্র তাদের অবস্থান ও অগ্রাধিকার তুলে ধরার সুযোগ পায়। এবারের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু, টেকসই উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফরে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ঝুঁকি, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।