কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে (১৩) হত্যার ঘটনায় শাহরিয়া আনাসসহ কয়েকজনকে আটক করেছে পুলিশ। আটকের আগে অপ্রতিমের মৃত্যুর খবরসংবলিত একটি ফটোকার্ড নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে শেয়ার করে শোক প্রকাশ করেছিলেন আনাস। ওই পোস্টে অপ্রতিমের সঙ্গে তার পরিচয় এবং বিভিন্ন সময়ের কথোপকথনের স্মৃতিও তুলে ধরেন তিনি।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাতে আটক হওয়ার আগে আনাস তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে অপ্রতিমের মৃত্যুর খবরসংবলিত একটি ফটোকার্ড শেয়ার করেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। বাচ্চাদের কাছে দামি জিনিস, তার জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ। আল্লাহ তার মা, বাবাকে ধৈর্য ধারণ করার তৌফিক দান করুক।’
অপ্রতিমের সঙ্গে নিজের কথোপকথনের কথাও ওই পোস্টে উল্লেখ করেন আনাস। তিনি লেখেন, ‘মাঝেমধ্যে ছেলেটা আমাকে মেসেজ দিয়ে বলত যে ভাই কই আছ ছবি তুলব কয়েকটা। আসলে এগুলো ভেবে এখন খারাপই লাগতেছে।’
বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়ে নিখোঁজ
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকার ভাড়া বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বের হয় অপ্রতিম। এরপর সে আর বাসায় ফেরেনি।
সন্তান বাসায় ফিরে না আসায় পরিবারের পক্ষ থেকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। এরপর পুলিশ অপ্রতিমকে উদ্ধারে তৎপরতা শুরু করে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত অপ্রতিমের মোবাইল ফোনের অবস্থান কুমিল্লার গন্ধমতী এলাকায় শনাক্ত করা যায়। এরপর ফোনটির আর কোনো অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
সিসিটিভি ফুটেজে তরুণের উপস্থিতি
অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে উদ্ধারে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা শুরু করে পুলিশ। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিন নামের এক তরুণকে দেখা যায়।
পরে তুহিনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শাহরিয়া আনাসকে আটক করা হয়।
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় ফাহিম আহমেদসহ আরও দুজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ও হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে তথ্য জানার চেষ্টা চলছে।
লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে মরদেহ উদ্ধার
অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তাকে উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১টার দিকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে এবং আটকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
অপ্রতিমের পরিচয়
ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম স্থানীয় বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। সে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম এবং কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান।
মাত্র ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিমের এমন মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং হত্যাকাণ্ডে কার কী ধরনের সম্পৃক্ততা ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে।