পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচন ঘিরে সকাল থেকেই ছিল বাড়তি নজরদারি। ভোটগ্রহণ নির্বিঘ্ন রাখতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের পাশাপাশি রাজ্য পুলিশের সদস্যদেরও মোতায়েন করা হয় বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রাম আসনে মোট ভোটার ২ লাখ ৬৬ হাজার ৪১৯ জন। অন্যদিকে, মুর্শিদাবাদ জেলার রেজিনগর আসনে ভোটার রয়েছেন ২ লাখ ৫৬ হাজার ৫৪৬ জন।
ভোট শুরুর পর রেজিনগরের একটি কেন্দ্রে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গিয়ে ভোট দেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির (এজেইউপি) প্রতিষ্ঠাতা হুমায়ুন কবীর। নন্দীগ্রামে ভোট দেন কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান।
ভোট দেওয়ার পর অবশ্য নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে অভিযোগ তোলেন মিলন প্রধান। তার দাবি, সোমবার রাত থেকেই বিভিন্ন এলাকায় ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে এবং তার নির্বাচনী এজেন্টদের হুমকি দেওয়া ও তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ।
নন্দীগ্রামে বহুমুখী লড়াই
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে একাধিক দলের প্রার্থী থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে বহুমুখী। বিজেপির হয়ে লড়েছেন হাসিরানি রথ। কংগ্রেসের প্রার্থী মিলন প্রধান। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের প্রার্থী মোহাম্মদ এতেশামুল হক। এছাড়া সিপিআইয়ের শান্তিগোপাল গিরি এবং আইএসএফের আলী মোহাম্মদ সাবে মিরাজ খানও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস প্রথমে সঞ্চিতা প্রধান দে-কে প্রার্থী করেছিল। পরে তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থনের ঘোষণা দেয়।
নন্দীগ্রাম আসনটি রাজনৈতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই আসন থেকে জয়ী হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই নির্বাচনে ভবানীপুর আসনেও জয় পাওয়ার পর তিনি ভবানীপুর আসনটি ধরে রাখেন এবং নন্দীগ্রামের বিধায়ক পদ ছেড়ে দেন। ফলে আসনটি শূন্য হয়ে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়।
রেজিনগরে হুমায়ুনের আসনে লড়াই
মুর্শিদাবাদের রেজিনগরেও ছিল ভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণ। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রেজিনগর ও নওদা – দুই আসনেই জয় পেয়েছিলেন হুমায়ুন কবীর। পরে নওদা আসনটি রেখে রেজিনগর ছেড়ে দেওয়ায় সেখানে উপনির্বাচন হয়।
এই আসনে বিজেপির প্রার্থী শাখারভ সরকার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের রবিউল আলম চৌধুরী, এজেইউপির গোলাম নবী আজাদ, ঋতব্রত তৃণমূলের সফিউজ্জামান শেখ, কংগ্রেসের মোহাম্মদ আবদুল্লাহিল কাফি এবং সিপিআইএমের সৈয়দ আসাদ আলী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
রেজিনগরের ভোটের দিনও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। ভোট দেওয়ার পর পুলিশের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের ঘটনায় এজেইউপি প্রধান হুমায়ুন কবীরকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে পাল্টাপাল্টি অভিযোগও ওঠে।
প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট
দিন শেষে দুই কেন্দ্রেই ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিকেল ৫টা পর্যন্ত নন্দীগ্রামে ৭৯.৩৯ শতাংশ এবং রেজিনগরে ৭৮.৪২ শতাংশ ভোট পড়েছিল। পরে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী চূড়ান্ত ভোটার উপস্থিতি দুই আসনেই ৮০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছায়।
তবে ভোটগ্রহণকে ঘিরে বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে অনিয়ম, এজেন্টদের বাধা এবং ভোটে কারচুপির অভিযোগ তোলা হয়। কংগ্রেস দুই আসনেই পুনর্নির্বাচনের দাবিও জানিয়েছে। অন্যদিকে বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফলে ভোট শেষ হলেও দুই আসনের নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর ছাড়াও মঙ্গলবার তামিলনাড়ুর মাদুরান্তাকম ও ধারাপুরম, পুদুচেরির থাট্টানচাভাদি বিধানসভা আসন এবং আসামের নওগাঁও লোকসভা আসনেও উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয়েছে।
এখন নজর ৯ অক্টোবরের দিকে। ওই দিন নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরসহ উপনির্বাচন হওয়া আসনগুলোর ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণা করা হবে। ফল প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে, পশ্চিমবঙ্গের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ আসনে ভোটাররা কোন রাজনৈতিক সমীকরণকে বেছে নিয়েছেন।