বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশ মিলনায়তনে এ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। চুক্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান এইচ ই ইসা কারিম নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তির আওতায় আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত ‘ল্যান্ডলর্ড মডেল’-এ এনসিটি পরিচালিত হবে। এ মডেলে টার্মিনালের মালিকানা ও সার্বিক নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। আর নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য টার্মিনালের পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের দায়িত্ব পালন করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড।
১৫ বছরে ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ
চুক্তির ১৫ বছরের মেয়াদে এনসিটিতে প্রায় ১৫ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। এই অর্থের মধ্যে অগ্রিম অর্থপ্রদান, টার্মিনাল আধুনিকায়ন, নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন, বিদ্যমান সরঞ্জাম হালনাগাদ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
বিনিয়োগের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই হিসেবে বাংলাদেশে আসবে বলে জানানো হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, এনসিটির পরিচালনা, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের দায়িত্বও থাকবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের ওপর। কনসেশন মেয়াদে এসব খাতে বাংলাদেশ সরকার বা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে না।
রাজস্বের অংশ পাবে চট্টগ্রাম বন্দর
কনসেশন চুক্তিতে রাজস্ব ভাগাভাগির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এনসিটিতে হ্যান্ডলিং হওয়া প্রতিটি টিইইউ (২০ ফুট সমমানের কনটেইনার) থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ রাজস্বের একটি অংশ পাবে।
চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি টিইইউ থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষের রয়্যালটি বা রাজস্বের অংশ ৪০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। টার্মিনালের গড় আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের রাজস্বের অংশও বাড়বে বলে জানানো হয়েছে।
এর ফলে টার্মিনালের কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও আয় বৃদ্ধির সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের রাজস্ব প্রাপ্তির পরিমাণও বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।
কর্মীদের ছাঁটাই না করার সিদ্ধান্ত
এনসিটির বর্তমান কর্মীদের নিয়েও চুক্তিতে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর টার্মিনালে কর্মরত কোনো কর্মীকে ছাঁটাই করা হবে না বলে জানানো হয়েছে।
বিদ্যমান কর্মীদের পর্যায়ক্রমে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কাঠামোর নতুন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে তাদের বিদ্যমান বেতন-ভাতা কমানো হবে না বলেও জানানো হয়েছে।
কনসেশন মেয়াদে স্থানীয় কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও আধুনিক টার্মিনাল পরিচালনার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
আধুনিক প্রযুক্তি ও অটোমেশন
এনসিটি পরিচালনায় আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও পরিবেশগত মানদণ্ড বাস্তবায়ন করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৬০টির বেশি বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এনসিটির পরিচালন দক্ষতা বাড়ানো এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
উন্নত টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, অটোমেশন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে জাহাজ ও পণ্যবাহী ট্রাকের টার্নঅ্যারাউন্ড সময় কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ধাপে ধাপে ট্রাকের টার্নঅ্যারাউন্ড সময় ৯০ মিনিটে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে কাগজবিহীন কার্যক্রম চালু ও অটোমেশনের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মেয়াদ শেষে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর
কনসেশন চুক্তির ১৫ বছরের মেয়াদ শেষ হলে এনসিটি আবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
এর পাশাপাশি কনসেশন চলাকালে প্রযুক্তি, পরিচালন পদ্ধতি ও কারিগরি জ্ঞান স্থানীয় কর্মীদের মধ্যে স্থানান্তরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের নিজস্ব জনবলের দক্ষতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এনসিটির পরিচালনায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ও পরিচালন দক্ষতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে লজিস্টিকস খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এ উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে।