সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি ছিল তাঁর প্রথম জাতিসংঘ সফর। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার এবং দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থে কী অর্জন হলো। তা নিয়ে সফরের শুরু থেকেই আগ্রহ ছিল।
সফর শেষে সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে সফল ও ফলপ্রসূ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, নিউইয়র্কে চার কর্মদিবসে প্রধানমন্ত্রী মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর মধ্যে ছিল ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ-সংশ্লিষ্ট আটটি কর্মসূচি, চারটি উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক।
এসব বৈঠকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক শান্তির মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা, জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত জুলি বিশপ এবং জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহর সঙ্গেও বৈঠক করেন।
বোয়িংয়ের সঙ্গে ১১ বিমানের চুক্তি
সফরের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল মার্কিন বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ বিমানের ১১টি নতুন বিমান কেনার চুক্তি। ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অনুষ্ঠানে মার্কিন সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এটিকে বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাত সম্প্রসারণ এবং নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালুর সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলে বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি বিমান কেনার ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি হয়েছিল। নতুন ১১ বিমানের চুক্তির ফলে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থাটির বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আরও এগিয়েছে।
তবে প্রধানমন্ত্রী নিজে বোয়িং চুক্তির স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। তাঁর যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় নিউইয়র্কে চুক্তিটি সম্পন্ন হওয়ায় এটি সফরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ফলাফল হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা
সফরের শেষদিকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কৌশলগত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) সই হয়। ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে বাংলাদেশের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসাদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট জ্যাকব হেলবার্গ এতে স্বাক্ষর করেন।
এই সমঝোতায় শান্তিপূর্ণভাবে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার, পারমাণবিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা, সেফগার্ডস ও পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের মানদণ্ড অনুসরণের বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণের প্রচেষ্টার মধ্যেই এ সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এটিও প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি স্বাক্ষর করা চুক্তি নয়। এর আগে আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা কাঠামো নিয়ে সরকারের ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানিয়েছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থে হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ ধরনের সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া হবে।
‘যুক্তরাষ্ট্রের চাপ’ নিয়ে আলোচনা
বোয়িংয়ের বিমান কেনা এবং বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা। দুই বিষয় নিয়েই সফরের আগে-পরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে নানা আলোচনা হয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই এসব বিষয়ে বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ছিল।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের চাপ থাকার দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে সরকারের বক্তব্য এবং বিভিন্ন মহলের রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এ দুই চুক্তির ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত নথি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র।
প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরের সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা নিউইয়র্কে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, শেখ হাসিনার বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারতকে নিজেদের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এমন বক্তব্যের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।
বিষয়টি বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের পাশাপাশি শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানো এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের আলোচনাকেও সামনে নিয়ে আসে। এর আগে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত কয়েকজনকে ফেরত দেওয়ার বিষয়টি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্য ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের পাশাপাশি বৈশ্বিক শান্তি, মানবতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয় তুলে ধরেছেন বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও বাংলাদেশের উদ্যোগ ছিল দৃশ্যমান। বাংলাদেশ আয়োজিত রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, ন্যায্য রূপান্তর, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য নিয়েও বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। জেপিমরগ্যান চেজ আয়োজিত ওই বৈঠকে বিশেষ করে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
সফরকে কীভাবে দেখা হচ্ছে
সরকারের পক্ষ থেকে সফরটিকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। মাহদী আমিন বলেছেন, সীমিত সময়ের মধ্যে প্রতিটি কর্মসূচিতে বাংলাদেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা মিলিয়ে প্রায় ৮০টি কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।
অন্যদিকে কূটনৈতিক বিশ্লেষণের জায়গা থেকে দেখলে, সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ সফরটি ছিল একাধিক মাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে জাতিসংঘের বৃহত্তর মঞ্চে বাংলাদেশের জাতীয় ও বৈশ্বিক ইস্যু তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য-বিনিয়োগ, জ্বালানি, জনশক্তি রপ্তানি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বোয়িংয়ের ১১টি বিমান কেনার চুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার সমঝোতা সফরের সময়ের দুটি উল্লেখযোগ্য আনুষ্ঠানিক অগ্রগতি। তবে এসব উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে চুক্তি ও সমঝোতার পরবর্তী বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথের ওপর।
সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ সফরে একদিকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরা হয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিমান পরিবহন ও বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার মতো কয়েকটি ক্ষেত্রে নতুন পদক্ষেপ সামনে এসেছে। এখন এসব উদ্যোগ বাস্তবে কতটা ফল দেয়, সেটিই হবে সফরের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য মূল্যায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।