কিছু কিছু ইনিংস শুধু রানসংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। সেখানে মিশে থাকে সাহস, ধৈর্য, লড়াই আর অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তেমনই এক মহাকাব্য লিখলেন তাওহিদ হৃদয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে ব্যাট হাতে রীতিমতো ইতিহাস গড়লেন বাংলাদেশের এই তরুণ ব্যাটসম্যান। তাঁর অবিশ্বাস্য অপরাজিত ২৪২ রানের ইনিংসে ভর করে খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রথম ইনিংসে লিড নিয়েছে বাংলাদেশ।
ম্যাচের চিত্রটা একসময় বাংলাদেশের জন্য ছিল ভীষণ হতাশার। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসে করা ৩৫৬ রানের জবাবে ব্যাট করতে নেমে দ্বিতীয় দিন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ৩ উইকেটে ৮৮ রান। তৃতীয় দিন সকালে আশার প্রতীক হয়ে ক্রিজে ছিলেন হৃদয় ও অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম। কিন্তু দিনের খেলা শুরু হওয়ার পর একের পর এক উইকেট হারিয়ে আবারও বিপাকে পড়ে স্বাগতিকেরা।
একপর্যায়ে বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়ায় ৭ উইকেটে ১৮৪ রান। চোটের কারণে ওপেনার সাদমান ইসলাম আগেই ব্যাটিংয়ের বাইরে চলে যাওয়ায় কার্যত আট উইকেট হারানোর পরিস্থিতিতে ছিল দল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসের রান পেরোনো তখন অনেক দূরের স্বপ্ন। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে এক প্রান্ত আগলে রেখে অবিশ্বাস্য এক ইনিংস উপহার দেন হৃদয়।
৩৫৯ বল মোকাবিলা করে ২২টি চার ও ১১টি ছক্কায় ২৪২ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। তাঁর এই ইনিংস বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের নতুন রেকর্ড। এত দিন এই রেকর্ডের মালিক ছিলেন মুশফিকুর রহিম। ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অপরাজিত ২১৯ রান করেছিলেন বাংলাদেশের অভিজ্ঞ এই ব্যাটসম্যান। এবার সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেলেন হৃদয়।
গড়েছেন তিনি। তামিম ইকবালের সাত ছক্কার রেকর্ড ছাড়িয়ে হৃদয়ের ব্যাট থেকে এসেছে ১১টি ছক্কা। আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার বিশ্বরেকর্ড ১২টি। ওয়াসিম আকরাম ও ইয়াশাসভি জয়সওয়ালের সেই কীর্তি থেকে মাত্র এক ছক্কা দূরে থামতে হয়েছে তাঁকে।
টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম শতককেই ডাবল সেঞ্চুরিতে পরিণত করেছেন হৃদয়। বাংলাদেশের হয়ে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিতেই দ্বিশতকের দেখা পাওয়া ব্যাটসম্যানও তিনি। তাঁর এই অর্জন বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে ষষ্ঠ দ্বিশতক। এর আগে মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসান দ্বিশতক করেছেন। এবার তাঁদের পাশে নিজের নাম লিখিয়ে ফেললেন হৃদয়।
একদিকে উইকেট পড়ছিল, অন্যদিকে হ্রদয় ধীরে ধীরে নিজের ইনিংস বড় করছিলেন। প্রয়োজনের সময় আক্রমণ করেছেন, আবার সতীর্থদের রক্ষা করতে অনেক সময় রান নেওয়ার সুযোগও ছেড়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে শেষ দুই উইকেটে ব্যাট করার সময় তাঁর এই কৌশল ছিল চোখে পড়ার মতো।
হৃদয়ের লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় সহযোগিতা এসেছে তাইজুল ইসলাম ও তাসকিন আহমেদের কাছ থেকে। অষ্টম উইকেটে তাইজুলের সঙ্গে ১১৭ রানের জুটি গড়েন তিনি। সিলেটের মাঠে অষ্টম উইকেটে এটি সর্বোচ্চ রানের জুটি। তাইজুল নিজে করেন ৫৬ বলে ২২ রান। সংখ্যার হিসাবে তাঁর অবদান খুব বড় মনে না হলেও দীর্ঘ সময় উইকেটে টিকে থেকে হৃদয়কে সঙ্গ দেওয়াটাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তাইজুল ফিরে যাওয়ার পরও থামেননি হৃদয়। নবম উইকেটে তাসকিন আহমেদের সঙ্গে যোগ করেন আরও ৮৫ রান। এই জুটিও সিলেটের মাঠে নতুন রেকর্ড গড়েছে। তাসকিন ২৯ বলে ১২ রান করে বিদায় নিলেও তাঁর দায়িত্বশীল ব্যাটিং হৃদয়কে বড় ইনিংস খেলার সুযোগ করে দেয়।
শেষ দুই উইকেটে বাংলাদেশের সংগ্রহে যোগ হয় ২০২ রান। এর মধ্যে হৃদয়ের একার অবদান ১৬১ রান। টেস্ট ক্রিকেটে লোয়ার অর্ডারের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে এমন অবিশ্বাস্য লড়াই সত্যিই বিরল।
দিনের শুরুতে হৃদয়ের ব্যাটিংয়ের গতি ছিল কিছুটা মন্থর। আগের দিন ৮০ বলে ২৯ রান করে অপরাজিত ছিলেন তিনি। তৃতীয় দিন সকালে ফিফটি পূর্ণ করেন ১০৯ বলে। এরপর আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে মাত্র ৬২ বলের ব্যবধানে পৌঁছে যান শতরানে। অর্থাৎ ১৭১ বলে পূর্ণ করেন নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি।
সেঞ্চুরির পর যেন আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের ওপর চাপ তৈরি করে দ্রুত রান তুলতে থাকেন। তাইজুলের বিদায়ের সময় তাঁর সংগ্রহ ছিল ১৭৩। চা বিরতির ঠিক আগে চার ও ছক্কায় ১৯০ রানে পৌঁছে যান। বিরতির পর তাসকিনকে সঙ্গে নিয়ে পূর্ণ করেন ক্যারিয়ারের প্রথম দ্বিশতক। ৩০৪ বলে ২০০ রান পূর্ণ করেন তিনি।
চার ও ছক্কার বৃষ্টিতে বাংলাদেশের সংগ্রহ নিয়ে যান ৩৮৬ রানে। শেষ দিকে তাসকিনের বিদায়ে ইনিংসের সমাপ্তি ঘটে। হৃদয় থেকে যান অপরাজিত। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে জোমেল ওয়ারিক্যান সর্বোচ্চ চারটি উইকেট নেন। জেডেন সিলস পান দুটি উইকেট।
হৃদয়ের এই ইনিংসের গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর টেস্ট দলে জায়গা পাওয়া নিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা। আগের টেস্টে মুশফিকুর রহিমের চোটের কারণে সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। সেই ম্যাচে প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারায় সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছিল তাঁকে। এবার মুমিনুল হক সুস্থ না থাকায় একাদশে জায়গা পান হৃদয়। সুযোগের সদ্ব্যবহার করে সমালোচনার জবাব দিলেন ব্যাট হাতেই।
এদিকে দিনের শেষ ভাগে ব্যাট করতে নেমে খুব বেশি সময় পায়নি ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বাংলাদেশের বোলাররা শুরুতে উইকেট পাওয়ার চেষ্টা করলেও সফল হননি। তাসকিন আহমেদের প্রথম ওভারেই দুটি জোরালো আবেদনে রিভিউ নেয় বাংলাদেশ। কিন্তু দুবারই সিদ্ধান্ত নিজেদের পক্ষে আনতে ব্যর্থ হয় স্বাগতিকেরা।
শেষ পর্যন্ত কোনো উইকেট না হারিয়ে ৭ রান তুলে দিনের খেলা শেষ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ফলে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের ৩০ রানের লিডের পরও তারা পিছিয়ে আছে ২৩ রানে।
একসময় যে বাংলাদেশ ইনিংস হারের শঙ্কায় ছিল, সেই দলই এখন ম্যাচে লড়াই করার মতো অবস্থানে। আর এই পরিবর্তনের নেপথ্যে একটাই নাম—তাওহিদ হৃদয়। নিজের ব্যাটিংশৈলী, সাহস ও অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তায় তিনি শুধু একটি ম্যাচে দলকে বাঁচাননি, বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসেও নিজের নাম লিখিয়েছেন স্বর্ণাক্ষরে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম ইনিংস: ৩৫৬ রান।
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস: ৩৮৬ রান (তাওহিদ হৃদয় ২৪২*, মুশফিকুর রহিম ৩৪, তাইজুল ইসলাম ২২; জোমেল ওয়ারিক্যান ৪/১০৪)।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বিতীয় ইনিংস: ৭/০।
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৩০ রানে এগিয়ে। দিন শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজ পিছিয়ে ২৩ রানে।