বিভাগীয় শহর ময়মনসিংহে নারীদের জন্য কারিগরি শিক্ষার পৃথক প্রতিষ্ঠান চালুর দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। নতুন এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় ময়মনসিংহসহ বৃহত্তর অঞ্চলের নারী শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, তথ্যপ্রযুক্তি ও খাদ্যপ্রযুক্তির মতো কর্মমুখী বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে চাকরির পাশাপাশি আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করতে পারবেন।
প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. শওকত হোসেন জানান, ৮ থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত দুই বিভাগে সশরীরে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন হচ্ছে। এরপর ১১ অক্টোবর থেকেই প্রথম ব্যাচের ক্লাস শুরু হবে। নতুন শিক্ষার্থীদের পাঠদান নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। শিক্ষক-কর্মচারী পদায়ন, শ্রেণিকক্ষের আসবাবপত্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
শিক্ষক-কর্মচারী পদায়ন, প্রস্তুত শ্রেণিকক্ষ
প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যে নয়জন শিক্ষক ও ১২ জন কর্মচারী পদায়ন করা হয়েছে। শ্রেণিকক্ষের আসবাবপত্রসহ পাঠদানের প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সুবিধাও প্রস্তুত রয়েছে।
অধ্যক্ষ মো. শওকত হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়ন ও শিক্ষা কার্যক্রমের মান বাড়াতে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে ২০০ আসনবিশিষ্ট ছাত্রী হোস্টেলের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। দুর্গাপূজার ছুটি শেষে আবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে আসন বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। হোস্টেলে আসন বরাদ্দ কার্যকর হলে দূরবর্তী এলাকার ছাত্রীদের আবাসনসংক্রান্ত সমস্যাও অনেকটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল
ময়মনসিংহে সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের দাবি ও নাগরিক আন্দোলন। বিভাগীয় শহরে নারীদের কারিগরি শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
ময়মনসিংহ জেলা নাগরিক আন্দোলন ও উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার নূরুল আমিন কালাম জানান, প্রতিষ্ঠানটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের খবর ছড়িয়ে পড়লে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়। এ সময় সাংবাদিক নজরুল ইসলাম আন্দোলনের আলটিমেটাম দেন এবং সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পরবর্তী সময়ে ময়মনসিংহ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের পূর্ব পাশে মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে এবার প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে।
স্থানীয় নাগরিক আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম চালু হওয়া ময়মনসিংহের নারী শিক্ষার অগ্রযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং কর্মক্ষেত্রে তাঁদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটি ভূমিকা রাখতে পারে।
একাডেমিক ভবন থেকে ছাত্রীনিবাস – প্রস্তুত অবকাঠামো
প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্ব পালন করেছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। প্রকল্পের আওতায় একাডেমিক ভবন, ওয়ার্কশপ, প্রশাসনিক ভবন, ছাত্রীনিবাস, অধ্যক্ষের বাসভবন ও কর্মচারীদের কোয়ার্টার নির্মাণ করা হয়েছে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাসেল মিয়া জানান, প্রধান ভবনগুলোর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে রাস্তা, ড্রেন, সীমানাপ্রাচীর ও বৈদ্যুতিক সাবস্টেশনসহ অবশিষ্ট কাজ শেষ করার উদ্যোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও শিক্ষা উপকরণের উন্নয়ন সম্পন্ন হলে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। একই সঙ্গে ব্যবহারিক শিক্ষার জন্য ওয়ার্কশপ এবং সংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কর্মমুখী শিক্ষায় নারীদের নতুন সম্ভাবনা
ময়মনসিংহ বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা কাজী রানা বলেন, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হওয়ায় এ অঞ্চলের নারী শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হবে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং ফুড টেকনোলজিতে শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আধুনিক প্রযুক্তি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংশ্লিষ্ট কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন। এসব বিষয়ে প্রশিক্ষিত জনবলের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি কিংবা নিজস্ব উদ্যোগে কাজ করার সুযোগ খুঁজে নিতে পারবেন।
কারিগরি শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লে তাঁদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিবার ও সমাজে অবদান রাখার সুযোগও সম্প্রসারিত হতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবায়নে মানসম্মত পাঠদান, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, দক্ষ শিক্ষক এবং কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে শিক্ষার কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৮ সালে অনুমোদন পায় চারটি মহিলা পলিটেকনিক স্থাপনের প্রকল্প
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও রংপুরে চারটি সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপনের প্রকল্প ২০১৮ সালের ১২ মার্চ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়।
কারিগরি শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাই ছিল এ প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নারীদের জন্য কারিগরি শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে তাঁদের কর্মসংস্থানের উপযোগী দক্ষতা অর্জনের পথ তৈরি করাও এ উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
দীর্ঘ পরিকল্পনা ও অবকাঠামো নির্মাণের পর ময়মনসিংহ সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হওয়াকে তাই সংশ্লিষ্টরা প্রকল্প বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন।
বৃহত্তর ময়মনসিংহের নারী শিক্ষায় নতুন অধ্যায়
ময়মনসিংহ সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হওয়ায় প্রথম ব্যাচের ১০০ ছাত্রীর জন্য খুলছে কারিগরি শিক্ষার নতুন দুয়ার। পাশাপাশি বৃহত্তর ময়মনসিংহের নারী শিক্ষার্থীদের জন্যও তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, যথাযথ পাঠদান, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে নারী কারিগরি শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হবে। এর মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
দীর্ঘদিনের দাবি ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক যাত্রা তাই শুধু ১০০ ছাত্রীর শিক্ষাজীবনের নতুন অধ্যায় নয়; বরং ময়মনসিংহ অঞ্চলে নারী কারিগরি শিক্ষার প্রসারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।