ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট, পেনশনব্যবস্থা, দুর্নীতি ও যুদ্ধবিরোধী অবস্থানকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ইতালির মিলান, স্পেনের মাদ্রিদ, পর্তুগালের লিসবন থেকে আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানা। বিভিন্ন শহরে নিজেদের দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন হাজারো মানুষ। কোথাও বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হলেও কয়েকটি দেশে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, ধরপাকড় ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভের চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম ইউরোনিউজ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের বিক্ষোভগুলোতে সহিংসতার ঘটনা ঘটায় বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে। কয়েকটি শহরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি সেনাসদস্যও মোতায়েন করা হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে পেনশন বৃদ্ধি, সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, দুর্নীতি বন্ধ এবং যুদ্ধে জড়ানোর বিরোধিতা। এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষের চিত্র ফুটে উঠেছে।
ফ্রান্সের কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ইউরো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় এক হাজার সদস্য। শুধু প্যারিসেই আহত হয়েছেন প্রায় ১০০ বিক্ষোভকারী ও স্থানীয় বাসিন্দা।
আগের বিক্ষোভে সহিংসতার ঘটনা ঘটায় কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা জোরদার করে। তবে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়।
আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় শনিবার সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজারো মানুষ অংশ নেন। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।
শিক্ষার্থী, শিল্পী ও বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এসব বিক্ষোভে দুর্নীতি ও সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। এর আগে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় থেকেও দেশটিতে কয়েক দফা বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
ইউরো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব ঘটনায় ৩০০ জনের বেশি বিক্ষোভকারী ও পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এ ছাড়া কয়েক ডজন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারের নীতি এবং বিভিন্ন যুদ্ধে ইতালির সম্পৃক্ততার বিরোধিতা করে দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মিলান, রোম, তুরিন, নেপলস, বোলোনিয়া ও ফ্লোরেন্সসহ বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষ এসব কর্মসূচিতে অংশ নেন। কিছু স্থানে বিক্ষোভকারীদের একাংশকে বোতল, পাথর ও আতশবাজি ছুড়তে দেখা যায়। কয়েকটি এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও অন্যান্য ব্যবস্থা নেয়।
ইতালির পুলিশের বরাত দিয়ে ইউরোনিউজ জানিয়েছে, শনিবার আটটি শহরে বিক্ষোভের ঘটনায় নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া ৩৭১ জনকে সাময়িকভাবে আটক করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ১১০ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। আগের সপ্তাহের সংঘর্ষের পর দেশটির বিভিন্ন শহরে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে পেনশনভোগী ও তাঁদের সমর্থকেরা পেনশনব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। তাঁদের প্রধান দাবি, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেনশন বাড়াতে হবে এবং সর্বনিম্ন পেনশনের পরিমাণ ন্যূনতম মজুরির সমান করতে হবে।
এ ছাড়া নারী ও পুরুষের পেনশনের ব্যবধান কমানো এবং সরকারি পেনশনব্যবস্থাকে বেসরকারীকরণের হাত থেকে রক্ষার দাবিও জানিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং অবসরজীবনে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি তাঁদের দাবিতে গুরুত্ব পেয়েছে।
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে আবাসন সংকটের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন বিক্ষোভকারীরা। বাড়িভাড়া ও বাড়ির দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের আবাসন ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
বিক্ষোভকারীরা সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসনের ব্যবস্থা, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি এবং সাধারণ মানুষের আবাসন অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। এদিকে আবাসন সংকটকে কেন্দ্র করে লিসবন ও পোর্তোতে তাঁবু টানিয়ে অবস্থান কর্মসূচিও পালন করেছেন আন্দোলনকারীরা। রোববার (২৫ অক্টোবর) এসব অবস্থানস্থল উচ্ছেদ করতে গিয়ে পুলিশ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভের কারণ এক নয়। কোথাও পেনশন ও শ্রমিকদের অধিকার, কোথাও আবাসন সংকট, আবার কোথাও দুর্নীতি, শিক্ষা ও যুদ্ধবিরোধী অবস্থান আন্দোলনের প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে।
তবে এসব বিক্ষোভের পেছনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসনের ক্রমবর্ধমান খরচ এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইউরোপের বিভিন্ন শহরে ধারাবাহিক বিক্ষোভের ফলে সরকারগুলোর ওপর জনদাবি মোকাবিলার চাপও বাড়ছে।
বিক্ষোভকারীদের দাবি পূরণে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলো কী পদক্ষেপ নেয়, তা নিয়ে নজর রয়েছে। একই সঙ্গে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার রক্ষা এবং সংঘর্ষ এড়ানোও কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: ইউরো নিউজ