রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে সড়ক অবরোধ অব্যাহত থাকায় বিপাকে পড়েছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনায় রিসোর্ট-কটেজের আগাম বুকিং বাতিল হতে শুরু করেছে। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকা তিন দফা দাবির কর্মসূচির অংশ হিসেবে শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে সাজেক-বাঘাইহাট সড়কের ১০ ও ১৪ কিলোমিটারসহ বিভিন্ন স্থানে অবরোধ পালন করা হয়। অবরোধকারীরা সড়কের বিভিন্ন জায়গায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। এতে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন বলেন, অবরোধ অব্যাহত থাকায় সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে সাজেকের সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানান তিনি। এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব বিজয় কান্তি চাকমা বলেন, শুক্রবার সকালে সড়কের বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ পালন করা হয়েছে। তাঁদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
বিজয় কান্তি চাকমার দাবি, বৃহস্পতিবারের ঘটনায় তাঁদের শতাধিক সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আটজন গুরুতর আহত। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য অন্যত্র নেওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁদের নিজেদের উদ্যোগে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে বলে জানান এই সংগঠক। তবে চিকিৎসা নিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু লারমা) সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক ভ্যালি থেকে সরিয়ে নেওয়াসহ তিন দফা দাবিতে বুধবার বিকেলে অবরোধের ঘোষণা দেয় সংগঠন দুটি।
এরপর বৃহস্পতিবার সাজেক থেকে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সময় উজো বাজার এলাকায় সেনাবাহিনীর সঙ্গে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানায়, ঘটনার পর প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।
এ ঘটনায় মামলা হয়েছে কি না জানতে চাইলে ওসি তোফাজ্জল হোসেন বলেন, মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে।
অবরোধ ও সংঘর্ষের প্রভাব পড়েছে সাজেকের পর্যটন ব্যবসায়। রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সাজেকে প্রায় ১২০টি রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে তিন হাজারের বেশি পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।
দুর্গাপূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত রাখার পর সাজেক ভ্রমণে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এরপর পর্যটকদের আনাগোনা বাড়তে শুরু করে। কিন্তু বৃহস্পতিবার থেকে নতুন করে অবরোধ শুরু হওয়ায় আগাম বুকিং বাতিল করছেন পর্যটকেরা।
সাজেক রুইলুই হলিডে রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী মিশু দে বলেন, দুর্গাপূজার আগে থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁদের রিসোর্টের সব কক্ষ বুকিং ছিল। বৃহস্পতিবার অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনার পর শুক্রবার সকাল পর্যন্ত প্রায় ৬০ শতাংশ বুকিং বাতিল হয়েছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে অবশিষ্ট বুকিংও বাতিল হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় পর্যটকদের সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার পর পর্যটনকেন্দ্রটি কার্যত পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে।
তিনি জানান, অনেক রিসোর্ট-কটেজে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত আগাম বুকিং ছিল। অবরোধ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে সেগুলো বাতিল হচ্ছে। এভাবে বুকিং বাতিল অব্যাহত থাকলে সাজেকের পর্যটন খাতে বড় ধরনের ধস নামতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁর।
এদিকে সাজেকের উজো বাজারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অবরোধকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনার প্রতিবাদে শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ।
সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক নির্মল চাকমার পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার সাজেকে অবরোধ চলাকালে হামলা, লাঠিচার্জ এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের প্রতিবাদে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাজেকবাসীর দাবির প্রতি সমর্থন জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে সংগঠনটির সভাপতি উষাতন চাকমা জানান, শনিবার সকাল ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সড়ক ও নৌপথে অবরোধ চলবে।
তবে অ্যাম্বুলেন্স ও রোগীবাহী গাড়ি, শববাহী যান, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যানবাহন এবং সাংবাদিকদের বহনকারী গাড়ি এ কর্মসূচির আওতামুক্ত থাকবে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
দফায় দফায় অবরোধ ও নিরাপত্তাজনিত অনিশ্চয়তায় সাজেকের পর্যটন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে পর্যটকদের পাশাপাশি রিসোর্ট-কটেজ মালিক, পরিবহনশ্রমিক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জীবিকাও ক্ষতির মুখে পড়ছে।