সোমবার (১২ অক্টোবর) জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, রাশিয়া ইউক্রেনের গ্যাস স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো ও অন্যান্য স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। তাঁর মতে, ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও এ ধরনের হামলা অব্যাহত থাকা থেকে বোঝা যায়, মস্কো প্রস্তাবিত বিরতি মেনে চলতে প্রস্তুত নয়।
রোববার ট্রাম্প তাৎক্ষণিকভাবে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের ঘোষণা দেন। তবে জেলেনস্কি বলেছিলেন, এ ধরনের সমঝোতার বিষয়ে তিনি আগে অবগত ছিলেন না। পরে তিনি জানান, রাশিয়াও একই পদক্ষেপ নিলে ইউক্রেন এ উদ্যোগে সমর্থন দিতে প্রস্তুত। ফলে ঘোষণাটির বাস্তবায়ন নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ইউক্রেনের বিদ্যুৎ সঞ্চালন সংস্থা ইউক্রেনেরগোর তথ্য অনুযায়ী, রুশ হামলায় জ্বালানি সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় খারকিভ, দোনেৎস্ক ও জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে নতুন করে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জামের ওপর চাপ কমাতে দেশের কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সীমিত করা হয়েছে।
এদিকে কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো জানিয়েছেন, সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর দারনিতস্কি এলাকায় একটি ড্রোন ২৫ তলা আবাসিক ভবনে আঘাত হানে। এতে একজন নিহত ও ১১ জন আহত হন। ভবনটির আঙিনায় কয়েকটি গাড়িতেও আগুন ধরে যায়।
জ্বালানি স্থাপনায় হামলার অভিযোগের বিষয়ে রাশিয়ার পক্ষ থেকে একই সময়ের নির্দিষ্ট ঘটনাগুলো নিয়ে কী বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেছেন, ইউক্রেনকে সাময়িক স্বস্তি দেওয়ার মতো যুদ্ধবিরতির প্রয়োজন তিনি দেখেন না। মস্কো দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেনের সামরিক কার্যক্রমে সহায়তা করে। এমন স্থাপনাগুলোকে হামলার বৈধ লক্ষ্য হিসেবে বর্ণনা করে আসছে।
রাশিয়া ও ইউক্রেন কয়েক মাস ধরেই পরস্পরের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। এতে দুই দেশেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলোতে ইউক্রেনের হামলার ২৭৩টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১২৪টি।
অন্যদিকে, সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা (এসিএলইডি)-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরে ইউক্রেনের জ্বালানি নেটওয়ার্কে প্রভাব ফেলেছে। এমন রুশ হামলার খবর গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৪ গুণ বেশি।
জেলেনস্কি রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে ইউক্রেনের হামলাকে মস্কোর যুদ্ধ পরিচালনার অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমানোর প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, রাশিয়ার তেল ও গ্যাস খাতের আয় দেশটির যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত।
ট্রাম্প ইউক্রেনকে রাশিয়ার তেল অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। একই সময়ে রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেল সরবরাহের একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। এ চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জ্বালানি আমদানিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার বিষয়টিও এসেছে।
জেলেনস্কি নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সিদ্ধান্তকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য ‘উপহার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর আশঙ্কা, রাশিয়ার জ্বালানি আয়ের সুযোগ বাড়লে তা দেশটির যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতাকে সহায়তা করতে পারে।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধে সম্মত হয়েছে। তবে ক্রেমলিনের বক্তব্য এবং ইউক্রেনের অভিযোগের মধ্যে পার্থক্য থাকায় ঘোষণাটির বাস্তব অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
প্রস্তাবিত জ্বালানি যুদ্ধবিরতির প্রতি যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সমর্থন জানিয়েছে। তবে সমর্থনের পাশাপাশি রাশিয়া বাস্তবে এ বিরতি মেনে চলবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।
ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেছেন, রাশিয়া যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে। এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। এস্তোনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হচ্ছে না।
সব মিলিয়ে, জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের উদ্যোগ যুদ্ধের প্রভাব কমানোর সম্ভাবনা তৈরি করলেও ঘোষণার পরপরই নতুন হামলার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। প্রস্তাবিত বিরতি বাস্তবে কার্যকর হবে কি না, তা নির্ভর করছে উভয় পক্ষের পদক্ষেপ ও পরবর্তী কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর।