তাজমিন কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় পরিবারের সঙ্গে থাকত। সে নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার স্থায়ী বাড়ি যশোরে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারটি কুমিল্লায় বসবাস করছিল।
ফেসবুকে পরিচয়, কক্সবাজারে ভ্রমণ
পরিবারের দেওয়া তথ্য এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেসবুকের মাধ্যমে রাজু চৌধুরী (২০) নামের এক তরুণের সঙ্গে তাজমিনের পরিচয় হয়। তাদের মধ্যে অল্প সময়ের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বলে জানা গেছে। ওই তরুণের সঙ্গে তাজমিনের কক্সবাজার ভ্রমণের তথ্যও সামনে এসেছে।
তবে তাদের পরিচয়, সম্পর্কের সময়কাল এবং ভ্রমণের প্রতিটি ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও তদন্তের তথ্য আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ঘটনায় রাজুর সম্পৃক্ততার বিষয়ে পুলিশের নিশ্চিত বক্তব্য ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।
বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি ছাড়ে
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাজমিন বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলেছিল। পরে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তার মা কেয়া খাতুন সাংবাদিকদের জানান, মেয়ের সঙ্গে শেষ কথোপকথনে তাজমিন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে রয়েছে। মা তার কাছে বান্ধবীর নাম ও পরিবারের পরিচয় জানতে চাইলেও সে বিস্তারিত জানায়নি।
তাজমিন ঠিক কবে কক্সবাজার গিয়েছিল, সে বিষয়ে প্রাথমিক তথ্যের মধ্যে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজার থেকে বাসে করে কুমিল্লায় ফেরার সময় তার চলাচলের কিছু দৃশ্য সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে।
সিসিটিভি ফুটেজে বাস থেকে নামার দৃশ্য
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার রাতে কক্সবাজার থেকে আসা আইকনিক এক্সপ্রেসের একটি বাস কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোড এলাকায় পৌঁছায়। রাত আনুমানিক ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে তাজমিনকে বাস থেকে নামতে দেখা যায় বলে সিসিটিভি ফুটেজের বরাতে জানানো হয়েছে।
কক্সবাজারের একটি ট্রাভেল এজেন্সির কর্মীর বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার আগের দিন তাজমিন ও তার সঙ্গে থাকা এক তরুণ বাসের টিকিটের বিষয়ে কাউন্টারে গিয়েছিল। তবে ওই কর্মী তাঁদের যাত্রী হিসেবেই দেখেছিলেন। এ তথ্যের ভিত্তিতে তাঁদের সম্পর্ক বা পরবর্তী ঘটনার বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
বাড়ি ফেরার পথে অটোরিকশায় ওঠে তাজমিন
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টার দিকে পদুয়ারবাজার বিশ্বরোড এলাকার একটি বাস কাউন্টারের সামনে থেকে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমিন। ওই অটোরিকশার চালক ছিলেন সুমন মিয়া (৩৫)।
পুলিশ জানায়, তাজমিনকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে সুমন নির্জন স্থানে নিয়ে যান। সেখানে তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পরে ৮ অক্টোবর সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার সুমন
এ ঘটনায় হত্যা মামলা হওয়ার পর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও লালমাই থানা-পুলিশ যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে সুমন মিয়াকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে।
১০ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুমন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে মামলার চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত আদালতের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে।
তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে শেষ যাত্রার তথ্য
তাজমিনের কক্সবাজার যাত্রা, কুমিল্লায় ফিরে আসা, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা চলাচল এবং বাড়ি ফেরার জন্য অটোরিকশা নেওয়ার ঘটনাগুলো তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত তরুণের সঙ্গে তার যোগাযোগের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
এক কিশোরীর এমন মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের সদস্যদের শোকের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও অপরাধ তদন্তের প্রশ্নও সামনে এসেছে। ঘটনার প্রতিটি তথ্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা এখন তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।