মাগুরায় এক আবাসিক গ্রাহকের মাত্র ২৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে ৫০৬ কোটি ৮৩ লাখ ১১ হাজার ৫৯৩ টাকার বিল দেওয়ার ঘটনায় মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মো. মহিতুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের জরুরি নির্দেশে বুধবার বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এ ব্যবস্থা নেয়।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঘটনাটি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর বিষয়টি মন্ত্রীর নজরে আসে। এরপর তিনি জরুরি তদন্তের নির্দেশ দেন এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জিএমকে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দেন।
ঘটনাটি ঘটেছে মাগুরা সদর উপজেলার মঘি ইউনিয়নের কেচুয়াডুবি গ্রামে। ওই গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শহীদুল ইসলামের স্ত্রী মোছা. আলেয়া খাতুনের নামে সেপ্টেম্বর মাসের বিদ্যুৎ বিল ইস্যু করা হয়।
বিলের তথ্য অনুযায়ী, ৮ আগস্ট মিটারের রিডিং ছিল ১৬০ ইউনিট। ৮ সেপ্টেম্বর সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯৫ ইউনিটে। অর্থাৎ এক মাসে ওই গ্রাহকের বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে ২৩৫ ইউনিট। কিন্তু এই ব্যবহারের বিপরীতে বিল তৈরি করা হয় ৫০৬ কোটি ৮৩ লাখ ১১ হাজার ৫৯৩ টাকা।
বিলের বড় অংশই আসে ডিমান্ড চার্জ থেকে। সেখানে ৪৮২ কোটি ৬৯ লাখ ৬৩ হাজার ৪২২ টাকা ডিমান্ড চার্জ দেখানো হয়। এর সঙ্গে ২৪ কোটি ১৩ লাখ ৪৮ হাজার ১৭১ টাকা ভ্যাট এবং ১০ টাকা মিটার ভাড়া যোগ করা হয়। সব মিলিয়ে মোট বিল দাঁড়ায় ৫০৬ কোটি ৮৩ লাখ ১১ হাজার ৫৯৩ টাকা।
এমন অস্বাভাবিক অঙ্কের বিল দেখে হতবাক হয়ে যান গ্রাহক ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয়ভাবে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
মিটার পরিবর্তনের সময় ভুল
প্রাথমিক তদন্তে অস্বাভাবিক বিল তৈরির কারণও শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। তদন্তে দেখা যায়, গ্রাহকের মিটার পরিবর্তনের সময় মিটারের সিল নম্বরের ডিজিটগুলো ভুল করে ডিমান্ড চার্জের ঘরে পোস্ট করা হয়েছিল। এই ভুল তথ্যের ভিত্তিতেই সফটওয়্যারে অস্বাভাবিক পরিমাণের ডিমান্ড চার্জ যুক্ত হয়ে যায় এবং কয়েকশ কোটি টাকার বিল তৈরি হয়।
মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আড়পাড়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. রেজাউল করিমও বিষয়টি ভুলভাবে তথ্য প্রবেশের কারণে হয়েছে বলে জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মিটার পরিবর্তনের সময় সিল নম্বরের অঙ্ক ডিমান্ড চার্জের ঘরে চলে যাওয়ায় অস্বাভাবিক বিলটি তৈরি হয়েছিল।
বিষয়টি ধরা পড়ার পর বিদ্যুৎ বিভাগ বিলটি সংশোধন করে। সংশোধিত হিসাবে ২৩৫ ইউনিট ব্যবহারের বিল দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৬৩ টাকা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিল পরিশোধ না করলে বিলম্ব মাশুলসহ তা ২ হাজার ৫৬ টাকা হওয়ার কথা ছিল। গ্রাহক আলেয়া খাতুন সংশোধিত বিলের ১ হাজার ৯৬৩ টাকা পরিশোধ করেছেন।
গ্রাহককে ফোন করে দুঃখ প্রকাশ মন্ত্রীর
অস্বাভাবিক বিলের বিষয়টি জানার পর ভুক্তভোগী গ্রাহক আলেয়া খাতুনের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। এ সময় তিনি ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং এর কারণে গ্রাহকের সাময়িক মানসিক চাপ ও উদ্বেগের জন্য ক্ষমা চান।
মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মন্ত্রী গ্রাহককে আশ্বস্ত করেছেন যে বিলটি সংশোধন করা হয়েছে এবং সংশোধিত বিল তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত কোনো সমস্যা হলে সরাসরি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর জন্যও তিনি গ্রাহককে অনুরোধ করেন।
অন্যদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা
ঘটনাটিকে দায়িত্ব পালনে গুরুতর ও অগ্রহণযোগ্য অবহেলা হিসেবে দেখছে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়। এ কারণে শুধু জিএমকে সাময়িক বরখাস্ত করেই ব্যবস্থা শেষ করা হচ্ছে না। প্রাথমিক তদন্তে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাঁদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মইনুল হাসানের সই করা চিঠির মাধ্যমে মো. মহিতুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে। বরখাস্তকালীন সময়ে তিনি জিএমের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।
মন্ত্রী বলেছেন, জনগণের দুর্ভোগ কমাতে বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ ধরনের ঘটনায় সেবার মান ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি একদিকে যেমন বিদ্যুৎ বিল তৈরির প্রক্রিয়ায় তথ্য প্রবেশ ও যাচাইয়ের গুরুত্ব সামনে এনেছে, অন্যদিকে গ্রাহকের কাছে বিল পাঠানোর আগে অস্বাভাবিক তথ্য শনাক্ত ও যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।