পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য নির্ধারিত সময়ে ইউরেনিয়াম জ্বালানি বাংলাদেশে আনা সম্ভব হয়নি। ২৪ সেপ্টেম্বর জ্বালানিবাহী কার্গো উড়োজাহাজটির বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ফ্লাইটটি পরিচালনা করা যায়নি। নতুন সময়সূচি নিয়ে কাজ চলছে এবং রাশিয়ার পক্ষ থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে জ্বালানি বাংলাদেশে পৌঁছানোর সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে টেলিফোনে তিনি জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ইউরেনিয়াম বহনকারী একটি কার্গো উড়োজাহাজ ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে আসার কথা ছিল। কিন্তু উড়োজাহাজটি পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে জ্বালানি দেশে আনা সম্ভব হয়নি।
মন্ত্রী বলেন, পাকিস্তান কেন ওই ফ্লাইটকে তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি, তার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো বাংলাদেশ জানতে পারেনি। জ্বালানি পরিবহনের জন্য নতুন সময়সূচি নির্ধারণের কাজ চলছে। রাশিয়া জানিয়েছে, অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে চালানটি বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম এএনআইকে জানান, নির্ধারিত সময়ে ইউরেনিয়ামবাহী উড়োজাহাজ আসার কথা থাকায় বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও অপেক্ষায় ছিলেন। পরে রোসাটমের লিয়াজোঁ কর্মকর্তার কাছ থেকে আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ার বিষয়টি জানানো হয়।
তিনি বলেন, পরিস্থিতির কারণে চালানটি পাঠানো সম্ভব হয়নি এবং নতুন করে সময়সূচি নির্ধারণ করতে হবে। তবে কোন পর্যায় থেকে ফ্লাইটটির অনুমতি আটকে গেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এএনআই রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটমের একজন প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য এই জ্বালানি
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়াবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটমের কারিগরি সহায়তায় পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। প্রকল্পের চুল্লিগুলো রাশিয়ার ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির তৃতীয় প্রজন্মের রিঅ্যাক্টর।
এর আগে চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল রূপপুরের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং শুরু হয়। এর মাধ্যমে কেন্দ্রটির কমিশনিং ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করে। প্রথম ইউনিট থেকে ধাপে ধাপে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি চলছে।
প্রথম ইউনিটের জ্বালানি এসেছিল ২০২৩ সালে
রূপপুরের প্রথম ইউনিটের জন্য রাশিয়া থেকে প্রথম দফায় স্বল্পমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জ্বালানি ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বাংলাদেশে আনা হয়। বিশেষ কার্গো উড়োজাহাজে করে জ্বালানি রাশিয়া থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থায় সড়কপথে ঈশ্বরদীর রূপপুর প্রকল্প এলাকায় নেওয়া হয়।
জ্বালানি তৈরির সঙ্গে রাশিয়ার নভোসিবির্স্ক কেমিক্যাল কনসেনট্রেটস প্ল্যান্ট (NCCP) যুক্ত ছিল। রূপপুর প্রকল্পের জ্বালানি সরবরাহকারী রাশিয়ার টিভিইএল (TVEL), যা রোসাটমের জ্বালানি বিভাগের অংশ।
২০২৩ সালে ঢাকায় পৌঁছানোর পর ইউরেনিয়াম জ্বালানি বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থায় রূপপুরে নেওয়া হয়েছিল। এ সময় সড়কপথে নিরাপত্তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও নেওয়া হয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিবহনের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করে।
দ্বিতীয় চালানে কেন গুরুত্বপূর্ণ
রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের কমিশনিং ও পরবর্তী জ্বালানি লোডিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় পারমাণবিক জ্বালানি সময়মতো প্রকল্প এলাকায় পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ। জুনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, দ্বিতীয় ইউনিটে জ্বালানি লোডিং ২০২৭ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে এবং পুরো প্রকল্প ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত জ্বালানি পরিবহন বিলম্বিত হওয়ায় এখন নতুন পরিবহনসূচি নির্ধারণ করা হচ্ছে। রাশিয়ার দেওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে চালানটি বাংলাদেশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। সেটি বাস্তবায়িত হলে পরবর্তী ধাপে জ্বালানি নিরাপদে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
রাশিয়া-বাংলাদেশের সমন্বয়
রূপপুর প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও রোসাটমের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় চলছে। সেপ্টেম্বরে ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) ৭০তম সাধারণ সম্মেলনের সাইডলাইনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম ও রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভের বৈঠকেও রূপপুর প্রকল্পের অগ্রগতি এবং দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি আলোচিত হয়।
সেখানে প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরাপত্তা মান বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। রোসাটমও প্রকল্পে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও কৌশলগত সহায়তা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে।
ফলে দ্বিতীয় ইউনিটের ইউরেনিয়াম পরিবহনে সাময়িক এই বিলম্বের পর এখন মূল নজর নতুন পরিবহনসূচি চূড়ান্ত করা এবং নিরাপত্তা বিধি মেনে জ্বালানি বাংলাদেশে পৌঁছানোর ওপর। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে চালানটি পৌঁছানোর যে সম্ভাব্য সময়সূচি রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সেটিই এখন পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।