বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র প্রদীপ ভাণ্ডারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেহা বোরার একটি তারিখবিহীন সাক্ষাৎকারের ভিডিও শেয়ার করেন। সেখানে বাংলাদেশের আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে ভারতের তরুণদের চলমান প্রতিবাদ নিয়ে কথা বলতে শোনা যায় নেহাকে।
ভিডিওতে নেহাকে বলতে শোনা যায়, ‘এই দেশে আমরা সর্বত্র যে জেন-জি আন্দোলন দেখছি, তা প্রথমে বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল। আমাদের পথ দেখানোর জন্য এবং এই দেশের তরুণদের প্রতি সংহতি জানানোর জন্য আপনাদের অভিনন্দন জানাচ্ছি।’
বাংলাদেশের আন্দোলনকে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের দাবির সঙ্গে যুক্ত করে নেহা বলেন, ভারতের তরুণেরাও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করছেন। তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশ ও ভারতের তরুণদের পারস্পরিক সংহতি এবং একটি উন্নত দক্ষিণ এশিয়া গড়ার প্রত্যাশাও উঠে আসে।
ভিডিওটি সামনে এনে বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র প্রদীপ ভাণ্ডারি অভিযোগ করেন, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও তাঁর রাজনৈতিক বলয়ের উদ্দেশ্য শুধু সরকারের বিরোধিতা করা নয়, বরং ভারতে সরকার পরিবর্তন ঘটানো।
ভাণ্ডারির দাবি, নেহা বাংলাদেশের আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার কথা বলেছেন এবং ভারতে একই ধরনের পরিবর্তন দেখতে চান। তিনি এই বক্তব্যকে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তনের উদ্দেশ্যের প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
বিজেপির এই নেতা আরও অভিযোগ করেন, রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেসের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ভারতের সংবিধান ও গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। তবে এগুলো বিজেপির রাজনৈতিক অভিযোগ। নেহার ভিডিওতে বাংলাদেশের আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা থাকলেও, শুধু এই বক্তব্যের ভিত্তিতে ভারতে সরকার পরিবর্তনের কোনো ষড়যন্ত্র প্রমাণিত হয়েছে; এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন পরবর্তী সময়ে ব্যাপক গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। কয়েক সপ্তাহের আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ছাড়েন। বাংলাদেশের সেই আন্দোলন দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে।
নেহা বোরার বক্তব্যেও বাংলাদেশের আন্দোলনের সঙ্গে ভারতের তরুণদের প্রতিবাদের তুলনা উঠে এসেছে। তবে দুই দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি এক নয়। বাংলাদেশের আন্দোলনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে ভারতের চলমান প্রতিবাদের তুলনা করা হলেও, তা থেকে দুই দেশের পরিস্থিতি অভিন্ন; এমন সিদ্ধান্ত টানা যায় না।
২৯ বছর বয়সী নেহা বোরা ভারতের অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) জাতীয় সভাপতি। তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং বর্তমানে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড অ্যাস্থেটিকসে ডক্টরেট করছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে অংশ নিয়ে তিনি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসেন। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত ওই আন্দোলনে তাঁর বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে দিল্লির বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও তাঁকে সক্রিয় দেখা গেছে।
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে কথিত নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগে চলমান আন্দোলনেও নেহা সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে এসব অভিযোগ রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ; অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সম্প্রতি রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া ব্লক’-এর নেতাদের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে পদযাত্রায় অংশ নেন নেহা বোরা। ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে এ কর্মসূচি পালিত হয়।
রাহুল গান্ধী বিভিন্ন আন্দোলনকে সংবিধান ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার বৃহত্তর লড়াইয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সংবিধান রক্ষায় একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান ছিল।
অন্যদিকে, নেহা বোরার ‘বাংলাদেশ আমাদের পথ দেখিয়েছে’ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে বিজেপি ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিজেপি বক্তব্যটিকে সরকার পরিবর্তনের উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে। নেহার বক্তব্যে অবশ্য বাংলাদেশ ও ভারতের তরুণদের আন্দোলন, গণতন্ত্র এবং ভোটাধিকারের প্রসঙ্গই প্রধানভাবে উঠে এসেছে।
সব মিলিয়ে, একটি সাক্ষাৎকারের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ভারতের চলমান ছাত্র আন্দোলন, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে তরুণদের আন্দোলনের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
/এনডিটিভি