গোল করাই যেন তাঁর নেশা। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ যতই শক্তিশালী হোক, গোলের সুযোগ তৈরি হলেই ভয়ংকর হয়ে ওঠেন আর্লিং হালান্ড। শারীরিক শক্তি, দুর্দান্ত গতি, নিখুঁত ফিনিশিং আর গোলের সামনে অসাধারণ উপস্থিতি—সব মিলিয়ে বর্তমান ফুটবলের অন্যতম ভয়ংকর স্ট্রাইকার তিনি। এবার ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতা উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে নিজের নাম আরও উজ্জ্বলভাবে লিখলেন ম্যানচেস্টার সিটির এই নরওয়েজিয়ান তারকা। লিওনেল মেসির দুটি রেকর্ড ভেঙে প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে ৬০ গোলের মাইলফলকে পৌঁছানোর দ্রুততম ও সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হয়েছেন তিনি।
প্যারিস সেন্ট-জার্মেইয়ের (পিএসজি) বিপক্ষে ম্যাচে জোড়া গোল করে এই কীর্তি গড়েন হালান্ড। তবে ব্যক্তিগত অর্জনের রাতটি দলীয় সাফল্যে রাঙাতে পারেনি ম্যানচেস্টার সিটি। হালান্ডের দুই গোলের পরও পিএসজির কাছে ৪-২ ব্যবধানে হেরেছে ইংলিশ ক্লাবটি। দলের পরাজয়ে স্বাভাবিকভাবেই হতাশা থাকলেও ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকে ম্যাচটি হালান্ডের ক্যারিয়ারে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।
চ্যাম্পিয়নস লিগে গোল করার ধারাবাহিকতা ধরে রেখে একের পর এক নতুন উচ্চতায় উঠছেন হালান্ড। পিএসজির বিপক্ষে জোড়া গোলের মাধ্যমে প্রতিযোগিতাটিতে তাঁর গোলসংখ্যা পৌঁছেছে ৬০-এ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই মাইলফলকে পৌঁছাতে তাঁর প্রয়োজন হয়েছে মাত্র ৬০টি ম্যাচ।
এর আগে চ্যাম্পিয়নস লিগে ৬০ গোল করার জন্য সবচেয়ে কম ম্যাচ খেলার রেকর্ডটি ছিল আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসির দখলে। বার্সেলোনা ও পরবর্তী সময়ে প্যারিস সেন্ট-জার্মেইয়ের হয়ে খেলা মেসির ৬০ গোল পূর্ণ করতে লেগেছিল ৮০ ম্যাচ। সেখানে হালান্ড একই সংখ্যক গোল করেছেন মাত্র ৬০ ম্যাচেই। অর্থাৎ, মেসির তুলনায় ২০ ম্যাচ কম খেলেই এই মাইলফলক স্পর্শ করেছেন নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার।
এই পরিসংখ্যান হালান্ডের গোল করার অসাধারণ দক্ষতার পাশাপাশি চ্যাম্পিয়নস লিগে তাঁর ধারাবাহিক প্রভাবেরও প্রমাণ। ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর বিপক্ষে নিয়মিত গোল করা সহজ কাজ নয়। প্রতিপক্ষের কৌশল, রক্ষণাত্মক চাপ এবং বড় ম্যাচের স্নায়ুচাপ সামলে গোলের সুযোগ কাজে লাগাতে হয়। কিন্তু হালান্ডের ক্ষেত্রে গোল করার প্রবণতা যেন স্বাভাবিকাতেই পরিণত হয়েছে।
শুধু কম ম্যাচে ৬০ গোল করাই নয়, বয়সের দিক থেকেও মেসিকে ছাড়িয়ে গেছেন হালান্ড। চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে ৬০ গোল করা সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় এখন তিনি।
এই মাইলফলক স্পর্শ করার সময় হালান্ডের বয়স ছিল ২৬ বছর ৮৫ দিন। অন্যদিকে, মেসি ৬০ গোলের ঘরে পৌঁছেছিলেন ২৬ বছর ৮৬ দিন বয়সে। অর্থাৎ, মাত্র এক দিনের ব্যবধানে আর্জেন্টাইন তারকার রেকর্ড ভেঙেছেন হালান্ড।
ব্যবধানটি খুব সামান্য হলেও রেকর্ডের বিচারে এর গুরুত্ব কম নয়। কারণ, মেসির মতো একজন কিংবদন্তি ফুটবলারের রেকর্ড ভাঙতে হলে শুধু প্রতিভা থাকলেই চলে না; প্রয়োজন দীর্ঘ সময় ধরে অসাধারণ পারফরম্যান্স ধরে রাখা। হালান্ড সেই কাজটিই করে দেখাচ্ছেন। অল্প বয়সেই চ্যাম্পিয়নস লিগের গোলের তালিকায় এত দ্রুত এগিয়ে যাওয়া তাঁর সামর্থ্য ও কার্যকারিতার পরিচয় বহন করে।
হালান্ডের খেলার ধরন তাঁকে অন্য অনেক স্ট্রাইকারের চেয়ে আলাদা করেছে। প্রতিপক্ষের বক্সে সঠিক জায়গায় অবস্থান নেওয়া, সতীর্থের পাস বুঝে দ্রুত সামনে এগিয়ে যাওয়া এবং সামান্য সুযোগ থেকেও গোল বের করে আনার ক্ষমতা তাঁর বড় শক্তি। লম্বা গড়ন ও শারীরিক সামর্থ্যের কারণে বাতাসে বলের লড়াইয়েও তিনি বিপজ্জনক। আবার বক্সের ভেতরে বল পেলে দ্রুত শট নেওয়ার দক্ষতা তাঁকে রক্ষণভাগের জন্য বড় দুশ্চিন্তায় পরিণত করে।
ম্যানচেস্টার সিটির আক্রমণভাগে তাঁর উপস্থিতি প্রতিপক্ষকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনে বাধ্য করে। তাঁকে আটকে রাখতে গিয়ে রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের অনেক সময় নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়। আর সেই সুযোগে অন্য আক্রমণকারীদের জন্য জায়গা তৈরি হতে পারে। ফলে হালান্ডের অবদান শুধু গোলসংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর উপস্থিতি দলের সামগ্রিক আক্রমণেও প্রভাব ফেলে।
চ্যাম্পিয়নস লিগের মতো প্রতিযোগিতায় যেখানে ইউরোপের সেরা ক্লাব ও খেলোয়াড়েরা মুখোমুখি হন, সেখানে এমন ধারাবাহিকতা বজায় রাখা বিশেষ কৃতিত্বের বিষয়। মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো তারকারা দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রতিযোগিতায় গোলের রেকর্ড গড়েছেন। তাঁদের কীর্তি বছরের পর বছর ধরে নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের জন্য মানদণ্ড হয়ে আছে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে হালান্ডের দ্রুত উত্থান তাঁকে ভবিষ্যতের রেকর্ডের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
পিএসজির বিপক্ষে ম্যাচটি হালান্ডের জন্য একই সঙ্গে আনন্দ ও হতাশার। একদিকে দুটি রেকর্ড ভেঙে ৬০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন, অন্যদিকে তাঁর জোড়া গোলও ম্যানচেস্টার সিটিকে পরাজয় থেকে বাঁচাতে পারেনি। পিএসজির চার গোলের বিপরীতে সিটির গোলসংখ্যা ছিল দুটি। ফলে ব্যক্তিগতভাবে উজ্জ্বল পারফরম্যান্সের পরও মাঠ ছাড়তে হয়েছে হার নিয়ে।
ফুটবলে ব্যক্তিগত সাফল্য যত বড়ই হোক, শেষ পর্যন্ত দলীয় ফলাফলই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। হালান্ডও নিশ্চয়ই নিজের গোলের চেয়ে দলের জয়কেই বেশি গুরুত্ব দিতে চাইবেন। তবে এই ম্যাচে তাঁর রেকর্ড গড়া পারফরম্যান্স আবারও দেখিয়েছে, কেন তাঁকে বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা গোলস্কোরার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
চ্যাম্পিয়নস লিগে ৬০ গোলের মাইলফলক পেরিয়ে হালান্ড এখন নতুন লক্ষ্য নির্ধারণের সুযোগ পাচ্ছেন। সামনে তাঁর গোলসংখ্যা কত দূর এগোবে, তা নির্ভর করবে ধারাবাহিকতা, ফিটনেস এবং দলের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানের ওপর। তবে যেভাবে তিনি একের পর এক রেকর্ড ভাঙছেন, তাতে ভবিষ্যতে আরও বড় অর্জনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
মেসির দুটি রেকর্ড ভেঙে হালান্ড বুঝিয়ে দিয়েছেন, চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে নিজের জায়গা তৈরি করতে তিনি প্রস্তুত। পিএসজির বিপক্ষে ম্যানচেস্টার সিটির হার হয়তো রাতটির সবচেয়ে হতাশাজনক ঘটনা, কিন্তু হালান্ডের ব্যক্তিগত অর্জন সেই ম্যাচকে স্মরণীয় করে রাখবে। গোলের নেশায় বুঁদ এই স্ট্রাইকারের সামনে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ—রেকর্ডের এই যাত্রা কত দূর নিয়ে যেতে পারেন তিনি।